Main Menu

১২০০ করোনারোগীর লাশ দাফন করেছেন তারা

Sharing is caring!

তারা গোরখোদক। একটার পর একটা কবর খোঁড়াই তাদের কাজ। কবরে লাশ নামানোর কাজও তারাই করেন। লাশের ওপর বাঁশের চাটাই তারাই দেন। এরপর দুই হাত লম্বা বাঁশের টুকরাগুলো একটি একটি করে সাজিয়ে দেওয়া হয়। তারপর কোদাল দিয়ে মাটি দেওয়া শুরু হয়। এর মধ্যে স্বজনদের একজন একজন করে এক মুঠো মাটি দেয় কবরে। আস্তে আস্তে গোরখোদকরা কবরে মাটি ভরাট করার পর সমতল থেকে এক ফুট উচ্চতার মাটি বেশি করে স্থাপন করেন। এভাবেই গোরখোদকরা করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন। এই চিত্র রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানের।

এখানকার ৮ নম্বর ব্লকটি নির্ধারিত করা হয়েছে করোনায় মৃতদের জন্য। গত বছর মার্চ মাসে সারা দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দফায় খিলগাঁও তালতলা সরকারি কবরস্থানে মৃতদের দাফন শুরু হয়। কিন্তু স্থানসংকুলান না হওয়ায় ২৭ এপ্রিল থেকে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন শুরু হয়। গতকাল শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত কবরস্থানে করোনায় মারা যাওয়া ১ হাজার ১৮৬টি লাশ দাফন হয়েছে।

গতকাল দুপুরে ৮ নম্বর ব্লকে দেখা যায়, আগে থেকেই প্রায় ১০০ কবর তৈরি করে রাখা হয়েছে। কবরস্থানে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের পর দাফনের দায়িত্বে থাকা গোরখোদকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি থেকে স্ট্রেচারে করে সাদা কাফনে মোড়ানো মনিরুজ্জামানের (৫২) লাশ নামিয়ে আনেন স্বেচ্ছাসেবী ও মৃতের স্বজনরা। মনিরুজ্জামান গাজীপুরে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ছিলেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতালের আইসিইউতে তিনি চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান।

মনিরুজ্জামানের লাশ গোরখোদকরা কবরে নামান। প্রধান গোরখোদক লিয়াকত আলী, শফিকুল ইসলাম, মানিক, হাসান, হূদয়, রফিকুল ইসলাম ও সাইফুল ইসলাম একে একে বাঁশের চাটাই নামিয়ে দেন লাশের ওপর। এরপর বাঁশের লাঠি দেওয়া হয়। ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে কোদাল দিয়ে মাটি নামাতে থাকেন কবরে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে মাটি দেওয়া সম্পন্ন হয়। এরপর আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়েন পাশের খালি কবরে আরেক জনের দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে।

গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা মনিরুজ্জামানের দাফনের পরপর যাদের দাফন করা হয় তারা হলেন, লাভলী বেগম (৩৫), জাহানারা বেগম (৭৫), পিডিবির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আজিজুর রহমান (৭৩) ও রিনা আক্তার (৫১)।

রায়েরবাজার কবরস্থানের প্রধান গোরখোদক লিয়াকত আলী সরকার বলেন, ‘২৮ জন গোরখোদক রয়েছেন এই কবরস্থানে। গত বছর ২৭ এপ্রিল থেকে আমরা সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কবরস্থানের ৮ নম্বর ব্লকে করোনায় মৃত্যু হওয়া ১ হাজার ১৮৫টি লাশ দাফন করেছি। গোরখোদকদের কেউই করোনা আক্রান্ত হননি।’

গত বছরের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঐ সময় তো কবরস্থানে আমরা কাউকে পাইনি। এমনও দেখেছি যে অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ এসেছে, কিন্তু কোনো স্বজন আসেননি। স্বেচ্ছাসেবী ও আমরাই লাশ দাফন করেছি। অনেক সময় কবরস্থানের প্রবেশ গেটে দূর থেকে দাঁড়িয়ে স্বজনদের কাঁদতে দেখেছি। তারা একবার লাশ দেখতে চেয়েও লাশ দেখতে পাননি।’

তিনি আরো বলেন, ‘কার লাশ কে দাফন করে! এমনও হয়েছে, লাশ দাফনের এক মাস পরে স্বজনরা এসে কবরে নামফলক টাঙিয়ে দিয়েছেন। তখন ছিল করোনার এক অন্ধকার যুগ। এখন তো লাশ দাফন করতে স্বজনরাই আসেন।’

গোরখোদক সাইফুল ইসলাম জানান, তার বাড়ি নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বাকল জোড়া গ্রামে। ঢাকার রায়েরবাজারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে থাকেন। গত বছর এপ্রিল থেকে করোনায় মৃতদের দাফন করছেন। প্রতিদিন কবর খনন ও দাফনকাজ শেষে রাত ১১টার দিকে বাসায় ফেরেন। বাসায় ফেরার পর গোসল করে কাপড় পরিবর্তন করেন। এইটুকুই নিরাপত্তাব্যবস্থা। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। এখন পর্যন্ত তার স্ত্রী ও পরিবারের কেউই আল্লাহর দোয়ায় করোনা আক্রান্ত হননি।

গোরখোদক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কবর খোঁড়া ও দাফনকাজ শেষ করে রাতে বাসায় ফেরার সময় শুধু মনে হয়, আল্লাহ রাস্তায় জীবনটা সঁপে দিয়েছি। এই করোনায় কত মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। আমরা শুধু জীবন-জীবিকার জন্য কবর খনন করে যাচ্ছি।’

একই কথা জানান গোরখোদক মানিক। তিনি বলেন, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রায়েরবাজার এলাকায় থাকি। কবর খোঁড়া ও লাশ দাফনের পর স্বজনরা ১ হাজার ৫০০ টাকা দেন। এর বেশিও কেউ কেউ দিয়ে থাকেন। তবে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয় বাঁশ ও চাটাইয়ের দাম হিসেবে। কেউ যদি দিতে না চান, আমাদের কোনো দাবি নেই। আবার অনেকেই খুশি হয়ে এর বেশিও দেন। কবর দেখাশোনার জন্য কেউ কেউ টাকা দেন। তবে সিটি করপোরেশন থেকে কোনো টাকা বা পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না। এমনই তথ্য জানালেন গোরখোদক হাসান।

রায়েরবাজার কবরস্থানের সিনিয়র মোহরার আব্দুল আজিজ বলেন, ২৭ এপ্রিল থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করোনায় মারা যাওয়া ৮৪২ জনের লাশ দাফন হয়। প্রতিদিনই পাঁচ থেকে ১০ জন করে দাফন করা হয়। এর পর থেকে দাফনের সংখ্যা কমতে থাকে। তবে ১ এপ্রিল থেকে প্রতিদিন আট থেকে ১০টি লাশ দাফন করা হচ্ছে। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত করোনায় মৃত ১ হাজার ১৮৬টি লাশ দাফন করা হয়েছে।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*