Main Menu

স্বৈরাচারী এরশাদ, প্রেমিক এরশাদ ও পিতা এরশাদ!

Sharing is caring!

এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সম্পর্কে আমার ভাইজি হয়। কারণ তার পিতা লেখক আবু বকর সিদ্দিক আমাদের বড় ভাইয়ের মতো। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে। বিদিশা যখন এরশাকে বিয়ে করে, তখনও আমি জানতাম না যে, সে সিদ্দিক ভাইয়ের মেয়ে। বিদিশা এরশাদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। এমনকি তার পিতাও। পিতার চেয়ে শ্বশুর বয়সে বড় হয়, সাধারণত এমনটি দেখা যায় না; কিন্তু এরশাদকে বিয়ে করে বিদিশাও সেই রেকর্ডটি ভঙ্গ করতে পেরেছিলেন। বুকের পাটা আছে বটে আমার ভাইঝির। আর জনাব এরশাদই বা কম কিসে? তিনিও যে বয়সে পুনর্বিবাহ করেছেন, তা করতে সাহস নয়, দুঃসাহস লাগে। অবশ্য তিনি সব সময় দুঃসাহসী মানুষই বটে। তিনি যখন রাষ্ট্রপতি আবদুর সাত্তারকে হটিয়ে দেশের ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তখন জিয়ার মতো মহাস্বৈরাচারীর পরিণামের কথা মনে রাখলে তিনি কি এই দুঃসাহস দেখাতে পারতেন?

আমি এরশাদকে বাহ্বা দিই, তিনি কবি, কবিমন তাঁর আছে। তিনি যাদের নিয়ে ‘কবিকণ্ঠ’ নামক একটি সংগঠন করে তাঁর পা চাটতে বাধ্য করেছিলেন, তাদের মধ্যে এখন অনেকেই ভোল পাল্টে ‘হরিনাম জপ’-এর মতো বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতির পিতাকে নিয়ে নিত্যদিন জিকির করে যাচ্ছেন। আর আওয়ামী লীগও এমন একটি দল, যাদের দরোজা সকল পথ ও মতের লোকদের জন্য শুধু খোলা নয়, একেবারে উন্মুক্ত। তাই এরশাদকে স্বৈরাচারী হিশেবে আন্দোলন করে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর পরও তাঁকেই আবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত মনোনীত করা হয়েছে, স্বৈরাচারের দোসরদের মন্ত্রী করা হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজানোদের অনেককেই মন্ত্রী করতে হয়েছে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর যারা ৭ই নভেম্বর ‘সিপাহী বিদ্রোহ’-এর নামে ট্যাংকের ওপর উঠে নৃত্য করেছিলেন, তারা একাদশ নির্বাচনের আগপর্যন্ত মন্ত্রী ছিলেন। মনোনয়ন না পেয়ে অভিমানে ও ক্ষোভে বিএনপির মনোনয়নের জন্য দৌড়ে চলে যাবার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে মাঝপথ থেকে কাউকে কাউকে ফিরিয়ে এনে মন্ত্রিত্ব দিতে হয়েছে। তাই স্বৈরাচার কথাটি এখন এরশাদের জন্য খুবই বেমানান ঠেকে। এরশাদ কি জিয়া, খালেদা জিয়া কিংবা তারেক জিয়ার চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী? তা হলে তিনি কী করে নির্বাচনে জনগণের ভোটে জিতে আসেন, তিনি কী করে জেলে না থেকে বাইরে থেকে সরকারি সবরকমের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করারও সুযোগ পান?

তাই আমি জনাব এইচএম এরশাদকে বাহ্বা দিতে চাই এ-জন্যে যে, তিনি রাজনীতিতে সকলের চেয়ে বেশি বুদ্ধি রাখেন। তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে অন্তত ‘যেমনি নাচাও তেমনি নাচি’ মতো অবস্থায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন! তিনি ও তাঁর দল জাতীয় পার্টি যদি সকল দলের অভ্যন্তরীণ রুমে জায়গা করার যোগ্যতা রাখেন, তা হলে তাঁকে কি স্বৈরাচারী বলার অধিকার কেউ রাখেন?

আসলে রাজনীতিক হিশেবে, শাসক হিশেবে, প্রেমিক হিশেবে এবং পিতা হিশেবে এরশাদ কতোটা সফল, তার জন্য বিদিশার সাম্প্রতিক স্বীকারোক্তি দেখে আমরা স্পষ্টতই বুঝতে পারি। ডিভোর্স নানা কারণে হতে পারে। কিন্তু ডিভোর্সের পরেও সাবেক স্ত্রীর সাবেক স্বামীর প্রতি যে আকুলতা আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে আমি একথা মানতে বাধ্য হচ্ছি, এরশাদ স্বামী হিশেবেও কতোটা সফল। প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন সফলতা সকলের ভাগ্যে জোটে না। এরশাদ ভাগ্যবান, বয়সে ৯০-এর কোটা পার হওয়ার পরও এতোদিন ধরে একটি দলকে বাঁচিয়ে রেখে নির্বাচনে এতোগুলো আসন জিতে নিয়ে আসার ক্যারিশমা তো শুধুই এরশাদের। এরশাদ না থাকলে জাতীয় পার্টি টিকে থাকবে? অসম্ভব। চেয়ারম্যান হিশেবে জিএম কাদেরের নাম ঘোষণা করা হলেও জাতীয় পার্টির মতো একটি জগাখিচুড়ি দলে আদর্শহীন লোকেরা কাদের সাহেবের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে দলকে টিকিয়ে রাখবেন, এটা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না। জাতীয় পার্টি যতোদিন থাকবে, তা এরশাদের নামের ওপর ভর করেই থাকবে। তার মানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদই একমাত্র চরিত্র, যাকে কিছুদিন বিএনপির প্রতিহিংসার শিকার হয়ে জেল খাটতে হয়েছিলো। তিনি বিএনপিতে ঝুঁকলে নিশ্চিতভাবেই যে খালেদা জিয়ার আপনগৃহেই স্থান পেতেন, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তার মানে এদেশের রাজনীতিতে এরশাদ এক অনিবার্য নাম, যাকে ছাড়া আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কারোরই চলে না! সে-সুযোগে এইচএম এরশাদ রাজনীতিতে যেমন আধিপত্য বিস্তার করে আছেন, তেমনি প্রেমিক হিশেবে বিদিশার মতো মেয়ের মন জুড়েও তাঁর স্থানকে নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। এটা বিদিশার গর্ভে এরশাদের সন্তান এরিকের জন্যও জরুরি বলে মনে করেন বিদিশা। বিদিশা এরশাদের পিতৃস্নেহ সম্পর্কে বলেছেন, “এরশাদ এরিক ছাড়া পৃথিবীতে বোধহয় আর কাউকে এতো ভালাবাসেননি।” এর মাধ্যমে তিনি যে আবেগমথিত কথা বলেছেন, তাতে এক মায়ের আন্তরিক স্বীকারোক্তিই ফুটে উঠেছে। একে তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। রাজনীতিতে যিনি স্বৈরাচারী, ব্যক্তিগত জীবনে তিনিই কতোটা প্রেমিক ও পিতৃচারী, এরশাদ তার নমুনা। ফলে যে যেভাবেই বলুন, জিয়া, খালেদা জিয়া কিংবা তারেক জিয়ার চেয়ে এরশাদ যে অনেক কম স্বৈরাচারী, বিদিশার স্টেটমেন্ট অন্তত সেটা ভাবতে আমাকে বাধ্য করছে। তাতে আমাকে যদি কেউ স্বৈরাচারের দোসর বলে অভিযুক্ত করে, আমি তাতে কিছু মনে করবো না।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*