Main Menu

উপ সম্পাদকীয়

সিটি নির্বাচন পরবর্তী স্মরণীয় এক আয়োজন

গত ১৭ আগস্ট (২০১৮), রাতে ‘এ মিলন যেন প্রাণের মেলা/ স্মৃতিঘন এক অতীত খেলা’ শ্লোগানে নগরীর ফরচুন গার্ডেন হোটেলের হলে জমে ওঠে একদল মানুষের আড্ডা, যারা রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে বিভিন্ন দল ও গ্রুপে বিভক্ত। কেউ কারো প্রতিপক্ষও। এই কিছুদিন আগেও সিলেট সিটি নির্বাচনে মনে হয়েছে একে অন্যের চরম শত্রু। কিন্তু আজ যেন সবাই এক এবং অভিন্ন। একের প্রেমে যেন অন্য প্রাণখোলা। এটা সিলেটের একান্ত বৈশিষ্ট্য।
সিলেটের মানুষ রাজনীতিতে বিভিন্ন দলে বিভক্ত থাকলেও মূলত কোন না কোনভাবে একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আত্মীয়তায় কিংবা বন্ধুত্বে আমরা সিলেটিরা একে অন্যের সাথে জড়িয়ে আছি। মাঝে মধ্যে কারণবশত আমরা বিভক্ত কিংবা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও আমরা কোন না কোনভাবে একে অন্যকে বুকে টেনে নিই।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি ভোটযুদ্ধের পর এমন একটি অনুষ্ঠানের জন্য আমি মনে মনে অপেক্ষায় ছিলাম, যেখানে প্রতিপক্ষ প্রতিপক্ষের হাতে হাত এবং বুকে বুক রেখে ভালোবাসায় জড়িয়ে নিবে। অবশেষে সেই আয়োজনই যেন করলেন আমার ছোট চাচা সৈয়দ মুজিবুর রহমান।
সৈয়দ মুজিব এক সময় সিলেটের ছাত্র রাজনীতিতে খুব আলোচিত ছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি সিলেট এইডেড হাইস্কুলে ক্লাস নাইনের ছাত্র অবস্থায় ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ১৩ মে শুক্রবার গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন। তখন জাসদের আরও অনেকেই জেলে ছিলেন। এমসি কলেজের ছাত্র থাকতে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে মুজিব-বাবুল পরিষদে তিনি সম্পূর্ণ প্যানেল নিয়ে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।
আজকে যারা সিলেটের রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা সমাজকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা কোন না কোনভাবে তাঁর বন্ধু। তাই তিনি ডাকলেন বন্ধুদের মিলনমেলা। আসলেন তাঁর বন্ধুদের মধ্যে বর্তমান সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট চেম্বার অব কমার্স সভাপতি খন্দকার সিপার, আওয়ামী লীগ জেলা যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট নিজাম উদ্দিন, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সিলেট জেলা জাসদের যুগ্ম সম্পাদক আলাউদ্দিন আহমদ মুক্তা, স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতা বিজিত চৌধুরী, এফআইভিডিবি-র দেবাশীষ দত্ত প্রবাল, বিএনপি নেতা এবং উসমানপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আনহার মিয়া, জাসদ নেতা ফেরদৌস আরবী, গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, আলীরগাঁও ইউনিয়নের ৩ বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া হেলাল, আমেরিকা প্রবাসী আনিস মিয়া, সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য সৈয়দ সাবির মিয়া, লন্ডনের টাওয়ার হেমলেট কাউন্সিলের কাউন্সিলর আহবাব, জনতা ব্যাংকের এমডি সত্যজিত, ফার্মাসিস্ট দিলিপ কুমার, লন্ডন প্রবাসী শিরন, ব্যবসায়ী এম এ মতিন, মন্জুর চৌধুরী, এডভোকেট আফতাব, আমেরিকা প্রবাসী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ শামীম, পূবালী ব্যাংকের অফিসার তোরণ মিয়া, ব্যবসায়ী তারেক চৌধুরী, রিয়াদ, দৌলত, শিক্ষক বুলবুল দৈনিক আজকের সিলেটের সোলেমান আহমদ প্রমুখ।
এছাড়াও এসেছিলেন সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি শফিক চৌধুরী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজেদুর রহমান ফারুক, লন্ডন প্রবাসী ছড়াকার দিলু নাসের, ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত পত্রিকা বাংলা মেইলের সম্পাদক সৈয়দ নাসির প্রমুখ আরও অনেকে।
‘এ মিলন যেন প্রাণের মেলা/ স্মৃতিঘন এক অতীত খেলা’ শ্লে¬াগানের এই প্রাণখোলা বন্ধু আড্ডা উপস্থিত সবাইকে আবেগে আপ্লুত করেছে। একে অন্যকে জড়িয়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। সবচে দেখার মতো দৃশ্য ছিলো যখন সিলেট সিটির বিএনপি থেকে নির্বাচিত মেয়র আরিফ চৌধুরীর সাথে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি শফিক চৌধুরী গলা জড়িয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। বিজিত চৌধুরীর চেয়ারের পাশে গিয়ে মেয়র আরিফ রুটির খন্ডাংশ বিজিত দার মুখে উঠিয়ে দিলেন। খাওয়া-দাওয়ার সময় হলেও কেউ যেন চেয়ারে বসতেই চাচ্ছিলেন না, সবাই নিকট অতীত থেকে শুরু করে দূর অতীতের স্মৃতিচারণ করছিলেন। আমার চাচার বন্ধুদের অনেকেই সেই সময় আমার বাবাকে ভয় এবং শ্রদ্ধা করতেন। কেউ কেউ আমার সাথে সেই সময়ে আমার বাবার দাপটের স্মৃতিচারণও করলেন। অতঃপর খাওয়া-দাওয়ার পর আরও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প চললো। যেতে যেতে অনেকে রাস্তায় দাঁড়িয়েও গল্প করছিলেন। কেউ কেউ ঠাট্টা-মশকরাও করছিলেন। খন্দকার সিপারকে কেউ কেউ বলছিলেন, ব্যবসায়িক নগরপিতা। বন্ধু-বান্ধবদের অনেকে আরিফ চৌধুরীকে কুদরতি মেয়র বলেও ডাকতে থাকলেন। সবাই যেন ভুলে গিয়েছিলেন রাজনৈতিক বিভেদ। সবাই যেন হয়ে গিয়েছিলেন একে অন্যের আপন এবং প্রিয়।
লেখক : গবেষক।