Main Menu

শুঁটকির হাটে বিড়াল চৌকিদার!

Sharing is caring!

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খানকে প্রধান করে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট ‘সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ গঠন করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। সাবেক এই মন্ত্রী ও পরিবহন শ্রমিক নেতার নেতৃত্বে কমিটির সুপারিশ বা কার্যক্রম কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের যুগ্ম সম্পাদক মো. হানিফ খোকন বলেছেন, ‘শাজাহান খানের নেতৃত্বে ২৩৩টি সংগঠন পরিবহনে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। তার পরিবহন ব্যবসাও রয়েছে। যেই নেতা পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তিনি কীভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাবেন? অতীতের রেকর্ড বলছে কমিটির সুপারিশ যাত্রীবান্ধব হবে না। এই কমিটি ‘শুঁটকির হাটে বিড়াল চৌকিদার’- এর মতো।’

এ সেক্টরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, এমন কমিটি আগেও বহুবার গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলো সুপারিশও করেছে। এখন সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করার কথা। নতুন করে আবার শুরু করার কথা নয়। কিন্তু পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের কারণে সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যায়নি। সুপারিশ বাস্তবায়নে যারা বাধা তারাই যদি কমিটির নেতৃত্বে থাকেন সেই কমিটি কতটা কার্যকর হবে সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভায় শাজাহান খানকে প্রধান করে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা রক্ষা ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ও সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ, বাংলাদেশ ট্রাক, কার্ভাড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওসমান আলী, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, নিরাপদ সড়ক চাই -এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, (বিআরটিএ) ডিআইজি হাইওয়ে, ডিআইজি অপারেশন, বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) , অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি)ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি। কমিটিকে পরবর্তী ১৪ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পরে প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ কারও কারও অভিমত, এর আগেও এ ধরনের একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। জানা গেছে, ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কিত একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি দীর্ঘ অনুসন্ধান করে তিন ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি সুপারিশমালা প্রণয়ণ করে। এই কমিটির সুপারিশের আলোকে ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সড়ক নিরাপত্তা এবং যানবাহনে নারী যাত্রীদের হয়রানি বন্ধে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ১৫ সদস্যের আরও একটি কমিটি করা হয়। আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কিত উপ-কমিটির সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব ছিল ওই কমিটির। এছাড়া কমিটি বাস ও মিনিবাসে নারী যাত্রীর যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে। ২২টি জাতীয় মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল বন্ধ ও হাইওয়ের পাশে অবৈধভাবে স্থাপিত বিলবোর্ড অপসারণের ব্যবস্থার সুপারিশ করে। কিন্তু ওই কমিটিগুলোর কোনও সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কিত ওই উপ-কমিটির প্রধান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন কেন আবার এই কমিটি গঠন করা হলো তা বুঝতে পারছি না। তখন আমাকে বলা হয়েছিল, এ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি কমিটি করে বিস্তারিত সুপারিশ প্রণয়ন করতে। তখন পরিবহন বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি উপযুক্ত সুপারিশমালা তৈরি করি। আমরা ওই সুপারিশমালাকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছি। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। ওই রিপোর্টটি ছিল সম্পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ। রিপোর্টে প্রতিটি সেক্টরকে নিয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘ওই রিপোর্টের সর্বশেষ অবস্থা কী তা আমরা জানি না। মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে ডাকাও হয়নি। কমিটির মধ্যেই যদি আমরা থেকে থাকি তাহলে উন্নতি আসবে না। যেখানে একটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আছে সেখানে আবার কেন কমিটি সে প্রশ্ন আমারও। যেখানে একটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট হয়েছে আমি মনে করি সেটাকে বাস্তবায়ন করা দরকার।’

জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এ ধরনের কমিটি আগেও অনেকবার গঠন করা হয়েছে। তারা সুপারিশও করেছেন কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এখন কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুধু সুপারিশ দিলে হবে না। সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য অর্থ খরচের বিষয় আছে। এজন্য যে অথরিটি আছে তাকে সে কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্য সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তা হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। কিন্তু দুর্ঘটনা রোধের জন্য যে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে সেই কমিটির প্রধান তো স্বীকারই করছেন না, দেশে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাহলে তার নেতৃত্বের কমিটি কী করতে পারবে।’ ইলিয়াস কাঞ্চন ওই বৈঠকের একটি সূত্র ধরে বলেন, ‘শাজাহান খান বৈঠকে বলেছেন, দেশে মানুষ বাড়ছে, পরিবহন বাড়ছে, দুর্ঘটনা তো বাড়বেই। এখন বিষয়টা হচ্ছে, সব কিছু বাড়বে তাই বলে দুর্ঘটনাও বাড়বে? এটা উনি সমর্থন দিতে পারেন? তার নেতৃত্বে গঠিত কমিটির কী হবে আমি বুঝতে পারছি না।’

এর আগেও অনেক কমিটি সড়কে শৃঙ্খলার বিষয়ে অনেক সুপারিশ করেছে। কিন্তু সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় বর্তমান কমিটি কি ধরনের সুপারিশ করবে বা তাদের সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহর কাছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান কমিটি পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করবে। আগের কমিটিগুলোর সুপারিশের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে এ রিপোর্ট তৈরি করা হবে। বর্তমান কমিটির প্রধান শাজাহান খানের নেতৃত্বে কোনও সমস্যা হবে বলে আমরা মনে করি না। কারণ এখানে মালিক শ্রমিকদের পাশাপাশি যাত্রী সাধারণেরও প্রতিনিধি রয়েছে।’

নবগঠিত কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘বর্তমান কমিটি কোনও কাজে আসবে কিনা সন্দেহ আছে। কারণ এর আগে অধ্যাপক আনোয়ার হেসেনের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করার পর সেই কমিটি এ সংক্রান্ত বিস্তারিত সুপারিশ করেছে। সেখানে কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন সময় হলো সে অনুযায়ী অ্যাকশনে যাওয়া। সে হিসেবে বোঝা যাচ্ছে, আমরা মনে হয় ভুল পথে আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই কমিটিকে তো নিরপেক্ষ বলা যাবে না। এই কমিটির মানেই হচ্ছে, আরও সময়ক্ষেপণ। সমস্যাটাকে আরও জিইয়ে রাখা। কারণ সুপারিশের কমতি নেই। এছাড়া সরকার বিভিন্ন কনসালটেন্সি ফার্ম থেকে সুপারিশ নিয়েছে। এখন তো অ্যাকশনে যাওয়ার কথা।’
আগের কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘কেন আগের কমিটিগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। নতুন করে সুপারিশ করার মানে হলো- আমরা আবার নতুন করে শুরু করলাম। নতুন করে সুপারিশে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। সুপারিশে যা আছে সেগুলো কেন বাস্তবায়ন করা হয়নি সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। আমি বলবো এক্ষেত্রে সরকার ঝুঁকি নিচ্ছে।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘শাহজাহান খান শ্রমিক নেতা নন, তিনি একাধিক পরিবহনের মালিক। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের দিয়ে কমিটি করা হাস্যকর। কমিটিতে কোনও যাত্রী প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মালিক শ্রমিকদের জিম্মি দশার কারণে যাত্রী সাধারণের স্বার্থ রক্ষা করতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। এক কথায় আমরা এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করছি।’ তার মতে, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল আইন অনুযায়ী ,এ কমিটির প্রধান থাকবেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। কিন্তু সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী আইন লঙ্ঘন করে এ কমিটি করেছেন। এখানে তিনি তার নিজের দায়দায়িত্ব অন্যকে চাপিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আকতার মাহমুদ বলেন, পরিবহন খাতের সমস্যাগুলো সবারই জানান। এখন কী করতে হবে সেটাও সবার জানা। আসলে এ ধরনের কমিটিতে এমন ব্যক্তিদের রাখা উচিত যাদের টেকনিক্যাল (কারিগরি) জ্ঞান রয়েছে। কমিটিতে প্রধান হিসেবে নয় বরং শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে থাকার কথা তার (শাজাহান খান)।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘শাজাহান খান একই সঙ্গে শ্রমিক ও সরকারের নীতিনির্ধারক। যার দুই পক্ষে অবস্থান রয়েছে তার দ্বারা সঠিক সিদ্ধান্ত আসবে না।’
এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মশিউর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নতুন এ কমিটি গঠন করার পর সোমবার সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছিলেন, দুর্ঘটনার বিষয়টিকে আমরা ফোকাস করেছি। দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাবো, হতাশ হবেন না। সড়কের উন্নয়ন করতে পেরেছি, এবার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাবো। হতাশ হবেন না। সাময়িক কিছু সমস্যায় আছি।’






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*