Main Menu

লকডাউনকে ‘অবৈজ্ঞানিক ও আংশিক’ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা

Sharing is caring!

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধের আশায় দেশব্যাপী জারি করা ৭ দিনের লকডাউনকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা “অবৈজ্ঞানিক ও আংশিক” মনে করছেন যেখান থেকে কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

তারা বলছেন, লকডাউনের প্রথম দিনে কাঁচাবাজার এবং অন্যান্য স্থানে জনগণের ব্যাপক সমাগম, চলাচল ও জনসমাবেশ দ্বারাই বোঝা যায় জনগণ এই “আংশিক” শাটডাউনটিকে গুরুত্বের সাথে নেয়নি যেহেতু একই সাথে অফিস, কারখানা এবং অমর একুশে গ্রন্থমেলা খোলা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা জরুরি পরিষেবা ব্যতীত সকল অফিস, কল-কারখানা, বইমেলা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ১৪ দিনের একটি সম্পূর্ণ লকডাউন কার্যকর করার এবং কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে এটিকে কঠোরভাবে প্রয়োগ করার জন্য জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শ দিয়েছেন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার উভয়েরই ঊর্ধ্বগতি কমিয়ে আনার পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সোমবার (৫ এপ্রিল) সকাল থেকে এক সপ্তাহব্যাপী দেশব্যাপী লকডাউন চলছে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এটিই বাংলাদেশের প্রথম আনুষ্ঠানিক লকডাউন। গত বছরের ২৬ মার্চ সরকার করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় লকডাউন কার্যকর করার পরিবর্তে পরিবহন বন্ধের পাশাপাশি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল।

আংশিক লকডাউন নিরর্থক

ইউএনবির সাথে আলাপকালে ডব্লিউএইচও-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রাক্তন উপদেষ্টা প্রফেসর মুজাহেরুল হক বলেন, “সরকার কল-কারখানা, অফিস এবং এমনকি বইমেলা খোলা রাখায় আমরা এটিকে লকডাউন বলতে পারি না। এটি জনসাধারণের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করার বৈজ্ঞানিক উপায় নয়।”

তিনি বলেন, লকডাউন মানে পুরোপুরি মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। “লকডাউন মানে সবকিছু বন্ধ হয়ে থাকবে। কেবল কয়েকটি জরুরি পরিষেবা, ওষুধের দোকান এবং নির্দিষ্ট কিছু বাজার যেখান থেকে জনগণ খাবার কিনতে পারবে তা খোলা থাকতে পারে।”

মুজাহেরুল বলেন, সরকারের জারি করা ৭ দিনের এই নিষেধাজ্ঞা লকডাউনের নীতি ও সংজ্ঞার সাথে মেলে না। “এটি একটি অবৈজ্ঞানিক, অপরিকল্পিত এবং আংশিক লকডাউন। এটি ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে জাতিকে সাফল্য অর্জনে সহায়তা করবে না।”

জাতীয় প্রযুক্তি উপদেষ্টা কমিটির সদস্য বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, লকডাউন হলো জরুরি সেবা ব্যতীত সবকিছু বন্ধ করে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার সর্বজনস্বীকৃত ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে সরকার অনেক কিছুই খোলা রেখে আংশিক লকডাউন কার্যকর করেছে। সারাদেশে নয়, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে একটি আংশিক লকডাউন কার্যকর করা যেতে পারে। এটি কেবল শক্তি অপচয়, অর্থের অপচয়। এর মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না।”

অধ্যাপক নজরুল আরও বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য কোনো আইন ও এর কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় জনগণ লকডাউনটিকে গুরুত্বের সাথে নেয়নি।

লকডাউন ১৪ দিনের হওয়া উচিত

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এম এইচ চৌধুরী (লেনিন) বলেছেন, ভাইরাসের সংক্রমণকে কমিয়ে আনতে কমপক্ষে ১৪ দিনের সম্পূর্ণ একটি লকডাউন কার্যকর করা উচিত।

তিনি জানান, মানবদেহে করোনাভাইরাসের ইনকিউবেশনের সময়সীমা ২ সপ্তাহ। তাই ভাইরাসের সংক্রমণ চক্রটি ৭ দিনের লকডাউন দিয়ে ভেঙে ফেলা যায় না।

লেনিন বলেন, জনগণ প্রথম দিনেই সরকারের জারি করা ৭ দিনের এই নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন করেছে। কেননা তাদের মধ্যে এই শাটডাউন নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।

“আমি মনে করি সরকারের অবিলম্বে কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। আইন প্রয়োগকারীদের তদারকি বাড়াতে হবে যাতে কোনো জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে আসতে না পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত যাতে মানুষ অকারণে বাইরে ঘোরার সাহস না করতে পারে। নতুবা, আমরা এই শিথিল লকডাউন থেকে কোন ফলই পাবো না।”

জনপ্রতিনিধিদের জড়িত করা

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিটি স্তরের মানুষের বিশেষত জন প্রতিনিধিদের সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততা ব্যতীত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে এককভাবে এই লকডাউন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। “তবে লকডাউন বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধিদের জড়িত করার জন্য সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”

তিনি বলেন, লকডাউন কার্যকর করতে এবং জনসাধারণের অপ্রয়োজনীয় চলাচল বন্ধ করতে প্রতিটি এলাকায় একটি মনিটরিং টিম গঠন করা উচিত।

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, এই লকডাউনে কঠোরভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া দরিদ্রদের পাশে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন কীভাবে দাঁড়াতে পারে সে বিষয়ে সরকারকে নির্দেশনা দেয়া উচিত। “বাড়িতে খাবার না থাকলে লোকেরা বেরিয়ে আসবেই।”

এছাড়াও এই বিশেষজ্ঞ বলেছেন, স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে জনগণ কীভাবে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করবে সে সম্পর্কেও একটি স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা উচিত।

‘বড় ভুল’

আটটি বিভাগের জন্য গঠিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেছেন, লকডাউনের আগে জনগণকে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে সরকার ভুল করেছে। “লকডাউনের আগে ভাইরাস বহনকারী অনেক লোক বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিল যা সারা দেশে কেবল ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়বে।”

তিনি বলেন, লোকদের তাদের গ্রামের বাড়িতে যেতে না দেয়ার জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। “যে যেখানে অবস্থান করছেন সেখানে থাকার জন্যই এটি প্রয়োগ করা হয়েছে যাতে ভাইরাসটি ছড়িয়ে না পড়ে।”

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “লকডাউনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই সরকারের উচিত ছিল পরিবহন পরিষেবা বন্ধ করা। ফলে লোকেরা ঢাকা ছাড়তে পারত না।”

লকডাউন বাস্তবায়ন

ডা. ফয়সাল বলেন, “লকডাউন কার্যকর করার আগে সরকার ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। ১০টি মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত সরকার লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিল।”

তিনি বলেন, সরকার লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা না করেই কার্যকর করেছে। “কিছু সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে লকডাউনটিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ এখনও রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “দোকান ও শপিংমল এবং পরিবহন ছাড়া সবকিছুর খোলা রেখে এই লকডাউনের যৌক্তিকতা কী? বইমেলা অকারণে খোলা। এই মেলা এখনই বন্ধ করা উচিত। প্রয়োজনে এটি ভার্চুয়ালি চালানো যেতে পারে। মেলা ও অফিস খোলা রেখে জনগণের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।”






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*