Main Menu

যৌনকর্মে সম্মতি ও বিয়ের বয়স: কতটুকু অগ্রসর হয়েছে বাংলাদেশ?

Sharing is caring!

আপন দেহের উপর নারীদের পূর্ণ অধিকার কবে ছিল তা ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোতে নারীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য যেসব বিধান রয়েছে সেগুলোর কোথায়ও নারীর দেহে নারীদের অধিকার দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো বিধানে পূর্ববর্তী বিধানের চেয়ে ভিন্ন কিছু থাকলেও তার ভিন্নতা নারীদের পক্ষে ছিল না।

‘নারী’ বলতে কি বোঝায়? প্রাচীন কাল থেকেই বালক ও পুরুষের মধ্যে দৃশ্যমান পার্থক্য পরিলক্ষ্যিত হলেও শিশু থেকে নারীদের পৃথক করে দেখার মানবিক চেষ্টা খুবই সাম্প্রতিক কালের।

প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে একুশ শতকের দ্বারপ্রান্তেও নারী মানে যে কোনো বয়সের নারীকেই বোঝায়। যদিও অনেক আইনে নবজাতক, শিশু ইত্যাদি অভিধার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তারপরও নারীর বয়স শূন্য হলেও কার্যত সে নারীই। কারণ শিশু হলেও নারীকে বিয়ে দেওয়া যায়, বিয়ে করা যায়, তাকে নিয়ে বাণিজ্য কিংবা রাজনীতিও করা যায়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে শূন্য বয়সের নারী হয় নাকি?

হ্যা, হয়। পেটের সন্তানের বিয়ে যখন দেওয়া যায় তখন। বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর বয়স কেবল শূন্য, শূন্যের নিচে ঋণাত্মকও হতে পারে। বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতির বিষয়টি এক কালে কেউ চিন্তাও করেনি। আধুনিক কালেও যে গুরুত্বসহকারে করা হয়, তাও সন্দেহাতীত নয়। কারণ নারী সে তো নারীই।

প্রাচীন ও মধ্যযুগে নারীদের যৌন সম্মতির বয়স সাধারণভাবে নির্ধারণ করত তার পরিবার কিংবা গোত্র। যদিও ঋতৃস্রাব হওয়াকেই নারীর সাবালকত্বের প্রমাণ বলে ধরে নেবার রেওয়াজ সার্বজনীন তবুও ঋতুস্রাবের পূর্বেও নারীর বিয়ে দেবার প্রচলনও প্রাগৈতিহাসিক। পৃথিবীর অনেক সমাজ এমনকি অনেক আধুনিক ধর্মেও নারীর বিয়ের উত্তম বয়স রজঃস্বলা হবার পূর্বেই নির্ধারিত।

অনেক দেশে রাষ্ট্রীয় আইন নারীর শিশু অবস্থার বিয়েকে দণ্ডণীয় করা হলেও বিয়েকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি। অর্থাৎ নাবালিকাকে বিয়ে করলে বা বিয়ে দিলে স্বামী বা সংশ্লিষ্ট সকলের শাস্তি হতে পারে। কিন্তু শাস্তির পরেও ঐ নাবালিকা সেই স্বামীর স্ত্রীই রয়ে যাবে এবং দণ্ডবিধির আওতায় তার যৌনকর্ম ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে না যদি না ঐ নাবালিকা নারী অভিযোগ না করে।

পৃথিবীতে সর্ব প্রথম নারীদের যৌনসম্মতির বয়স নির্ধারিত হয়েছিল ইংল্যাণ্ডে ১২৮৫ সালে ওয়স্টমিনিস্টার আইনে। ১২৮৫ সালে ঐ আইনে যৌন সম্মতি বা বিবাহের বয়স ছিল ১০ বছর। এই বয়স ১৩ করা হয়েছিল ১৮৭৫ সালে। আর তা বাড়িয়ে ১৬ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮৮৫ সালে।

১২৮৫ সালের পূর্বে এ নিয়ে কোনো আইন ছিল না। তখন যে কোনো বয়সের নারীকে বিয়ে করা যেত। তাদের সাথে যৌনমিলনও ঘটানো যেত। বিয়ের বয়স তিন বছর বাড়াতে ব্রিটিশদের সময় লেগেছিল প্রায় ৬০০ বছর। তার পরের তিন বছর বাড়াতে সময় লেগেছিল মাত্র দশ বছর। তবে যৌন সম্মতির বয়স এর চেয়ে আর বেশি করার প্রয়োজন তারা বোধ করেনি। সর্বশেষ ২০০৩ সালের যৌন অপরাধ আইনেও তারা সম্মতির বয়স ১৬ রেখেছে।

১৭৯১ সালে প্রথম ফরাসি সংবিধানে নারীদের যৌনসম্মতির বয়স নির্ধারিত হয়েছিল সাত বছর। তবে সমসাময়িক কালে ইউরোপের অন্যান্য প্রগতিশীল রাষ্ট্রগুলোতে যৌন সম্মতির বয়স ১২ বছরের বেশি ছিল না। যদিও পৃথিবীর সকল আধুনিক রাষ্ট্রই বর্তমানে নারীর যৌন সম্মতির বয়স ১৪ থেকে ১৬ পর্যন্ত উন্নীত করেছে তবুও চিন্তার প্রাচীনতা থেকে এখনও বিশ্ব সমাজ মুক্ত হতে পারেনি। কোন কোন সমাজে যেমন দারিদ্র্য, নিরাপত্তার খাতিরে নারীদের অপরিণত বয়সেই যৌনকর্মে নিয়োজিত করা হয় তেমনি অনেক সমাজ আছে যেগুলোতে ধর্মীয় বিধান অনুসারেই নাবালিকাদের যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়।

প্রাচীন বা মধ্য যুগের বাংলা ভূখণ্ডে নারীদের যৌন সম্মতি বা বিবাহের বয়সের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ছিল না। এ দেশে এক সময় পেটের শিশুদের বিয়ে দেওয়ারও রেওয়াজ ছিল। ১৮৬০ সালের পেনাল কোডে যৌনকাজের সম্মতির বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রথমত ১০ বছর। তবে এ বয়স নির্ধারণ কেবল ছিল ধর্ষণজনিত কারণে যৌন সম্মতি নির্ধারণের জন্য। বিয়ের বয়স নিয়ে এ কোডে কোন বিধান ছিল না, এখনও নেই। যা হোক, ত্রিশ বছর পরে পেনাল কোড সংশোধন করে ১৮৯১ সালে যৌন সম্মতির বয়স উন্নীত করা হয় ১২ বছরে। তারও ৩৫ বছর পরে ১৯২৫ সালে তা উন্নীত করা হয় ১৪ বছরে বাংলাদেশের পেনাল কোডে যা এখনও অক্ষুন্ন রয়েছে।

বাংলাদেশের পেনাল কোড অনুসারে ১৪ বছরের কম বয়সের কোনো নারী কোনো পুরুষের সাথে যৌন মিলন করলে তা যদি সম্মতিসহকারেও হয় তবে তাকে ধর্ষণ বলে বিবেচনা করা হবে। তবে ঐ আইনে বিয়ের বয়সের কোনো বালাই ছিল না। কেবল ১৩ বছর বয়সের কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনত তবে সেটাকে আমলে নেওয়া হত, অন্যথায় নয়।

ভারত উপমহাদেশে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন পাশ হয়েছিল ১৯২৯ সালে যেখানে নারীর বিবাহের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ বছর ও ছেলেদের ১৮ বছর। কিন্তু ঐ সময় মুসলমান ধর্মালম্বীদের জোর আপত্তির মুখে পড়ে আইনটি। শেষ পর্যন্ত ১৯৩৭ সালে এ আইনে বিয়ের বয়সের বাধ্যবাধকতা থেকে মুসলিমদের বাদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ তখন বিয়ের ব্যাপারে মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় আইনের অধীনে যায় যেখানে মেয়েদের বিবাহের বয়সের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো বয়স উল্লেখ নেই। তবে যৌন সম্মতির সীমা হিসেবে মেয়েদের প্রথম ঋতুবর্তী হওয়াকেই ধরে নেওয়া হয় যা সর্বনিম্ন সাত বছরও হতে পারে।

ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকের ঘটনা। জনৈক হরিমোহন মাইতির সাড়ে এগারো বছর বয়স্ক স্ত্রী ফুলমনি সহবাসজনিত কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায়। ফুলমনির বয়স সাড়ে এগার হলেও তার স্বামীর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বছর। ঘটনাটি ব্যাপক প্রচার পায়। দেশে নয়, বিদেশের অগ্রসর সমাজের কাছে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে ইংরেজ সরকার। স্ত্রী হত্যার দায়ে হরিমোহনের বিচার হয়। তবে সেটা অবহেলাজনিত হত্যা ধর্ষণ বা স্ত্রীর অসম্মতিতে যৌনক্রিয়ার বিচার নয়।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিধিবদ্ধ হয় ‘সহবাস সম্মতি আইন’ (Age of consent Act) এতে বারো বছরের কম বয়সের বালিকার সঙ্গে সহবাস বলাৎকার জাতীয় অপরাধ বলে গণ্য হয়। বালিকা স্ত্রীর ক্ষেত্রেও এই আইন প্রযোজ্য। তবে এই আইনের বিরোধীয় বিভোর থাকে ভারতের হিন্দু মুসলিম দুই ধর্মের পুরহিতরাই। কারণ হিন্দু-মুসলিম কোনো ধর্মেই নারীদের যৌন সম্মতির কোনো বালাই ছিল না। হিন্দুদের নারীদের রজঃস্বলা হবার পূর্বেই স্বামীর ঘরে পাঠানোর ধর্মীয় নির্দেশ ছিল। আর মুসলমানদের তাগিদ তো মূল বিশ্বাসজাত।

তবে ১৯২৯ সালের পূর্বে ভারতের কোনো ধর্মের মানুষেরই বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। তাই আমাদের মহাপুরুষ যারা বাল্যবিবাহ নিরোধ ও বিধবা বিবাহের পক্ষে জানপ্রাণ ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রথম বয়সে তারাও বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছিলেন। যেমন রবীন্দ্রনাথের দাদা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ১৪ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন ৬ বছরের বালিকাকে। রবীন্দ্রনাথ যদিও বিয়ে করেছিলেন ২২ বছর বয়সে। কিন্তু সেই সময় তার স্ত্রীর বয়স ছিল ১১ বছর। বঙ্কিম চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের বিয়ে হয়েছিল মাত্র এগার বছর বয়সে । তার স্ত্রীর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর।

ব্রিটিশ সরকার কতৃৃক বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন পাশ হওয়ার খবরে তৎকালীন ভারতের গ্রামাঞ্চলে বাল্য বিবাহের এক অসুস্থ ধুম পড়ে পড়ে যায়। আইনটি বিধিবদ্ধ হওয়ার আগে এর আওতায় পড়ার ভয়ে বাঙলায় অনুষ্ঠিত হয়েছিলো লাখ লাখ বাল্যবিয়ে। এমনকি দুগ্ধপোষ্য শিশু থেকে গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গসম্ভাবনা স্থির করেও বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। ১৯৩১ সালের আদমশুমারির হিসেব মতে, তখন বালিকাবধূর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলো সাড়ে ৩২ লাখ থেকে ৫০ লাখে।

পাঁচ বছরের কম বয়স্ক শিশুবধূর সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো আট লাখ দু’ হাজারে। সেই সময় এমনও অবস্থা হয়েছে যে বিবাহিতা শিশুকন্যাকে বরের বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য মাকেও কন্যার সাথে পালকিতে সওয়ারি হতে হয়েছিল।

তবে বিবাহের বয়স ও যৌন কাজে সম্মতির বয়স এক জিনিস নয়। যৌন কাজে সম্মতির বয়স হলেও বাংলাদেশের আইনে কোনো নারীর বিবাহের বয়স হয় না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নারীর যৌন কাজে সম্মতির বয়স ১৬ বছর যা পেনাল কোডের সংজ্ঞা থেকে মাত্র দুই বছর বেশি। তবে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুসারে কোন নারীকে বিয়ের সম্মতি দিতে হলে তার বয়স হতে হবে কমপক্ষে ১৮ বছর।

কিন্তু আইনে নারীর বয়স যাই থাকুন না কেন, বাস্তবে যৌন কাজে সম্মতির ক্ষেত্রে নারীর বয়স বিবেচনা অহরহই ভঙ্গ করা হচ্ছে। এমনকি ২০২০ সালেও এমন একটি অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকার সাথে তার স্বামীর যৌন ক্রিয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার কালিয়া গ্রামের ১৪ বছর বয়সের নাবালিকা নুর নাহার। একই উপজেলার ফুলকি পশ্চিম পাড়ার বিদেশ ফেরত ৩৫ বছর বয়স্ক রাজিব খানের সাথে নুর নাহারের বিয়ে হলে বিয়ের পর থেকেই তার যৌনাঙ্গে রক্তক্ষরণ দেখা দেয়। ক্রমান্বয়ে রক্তক্ষরণ অপ্রতিরোধ্য হলে চিকিৎসারত অবস্থায় নুর নাহাার গত ২৪ অক্টোবর মারা যায়।

নাবালিকার বিয়ে ও যৌন সম্মতির বয়স নিয়ে চলে আসা প্রাগৈতিহাসিক বিতর্ক এখনও বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই চলমান।১৮৬১ সালের পেনাল কোর্ড, ২০০০সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কিংবা হাল আমলের বাল্য বিবাহন নিরোধ আইন, ২০১৭ কোনটিই বাংলাদেশের নারীদের অকাল বিয়ে ও অসম্মতিতে যৌনমিলন প্রতিরোধ কাঙ্খিত কার্যকরিতা পায়নি। শত বছরের প্রচেষ্টায় আমাদের সমাজে হয়তো কিছুটা সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু একটি আধুনিক সভ্য সমাজের মানদণ্ড অর্জন করতে আমাদের যেতে হবে বহুদূর।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*