Main Menu

মুফতি ওয়াক্কাস : স্রোতের বিপরীতে সাহসী আলেম নেতৃত্ব

Sharing is caring!

এদেশের আলেম উলামাদের মধ্যে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক, মুফতি ফজলুল হক আমিনী, মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী ও মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের মত আলেম উলামাদের সাথে খুব কাছা-কাছি থেকে কাজ করার, মেলামেশার ও রাজনীতি করার সুযোগ আমার হয়েছে। এটা অনেকটাই আমার সৌভাগ্য।

১৯৯৩ সালের শেষ দিকে মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের সাথে আমার পরিচয়। তবে, ঘনিষ্টতা হয়েছে ২০০২ সালের দিকে। মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের নেতৃত্বে টিপাইমুখ অভিমুখে লংমার্চ করতে গিয়ে তার সাথে আমার ঘনিষ্টতা। পরবর্তীতে ১৮ দলীয় জোট ও ২০ দলীয় জোট শরিক হিসাবে মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছে।

মঙ্গলবার দিন থেকেই থেকেই শরিরটা ভালো যাচ্ছিল না। রাতে একটু আগেই বিছানায় চলে গিয়েছিলাম। আবার ফজরের নামাজ পরেই বিছানায় চলে গিয়েছিলাম। মো মঞ্জুর হোসেন ঈসার একটা মানববন্ধন ছিল। শরিরের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। এর মধ্যে অলিদ সিদ্দিকী তালুকদারের কয়েকবারের ফোন কল পেয়ে রিসিভ করে শোক সংবাদটা শুনলাম। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস ইন্তেকাল করেছেন। খুব, শকড হলাম।

রাজনীতিতে অনেকটাই তার বিপরিত মেরুতে অবস্থান করলেও সম্পর্কের কখনো অবনতি হয়নি তার সাথে। ১৮ দলীয় জোট বা ২০ দলীয় জোট করতে গিয়ে দেখেছি এমন অনেকে তাকে অবহেলা করেছেন যারা হয়তো মুফতি ওয়াক্কাসের জুতা বহন করারও যোগ্যতাও রাখেনা। কিন্তু তিনি কখনো তাদের দিকে ভ্রু-কুচকেও তাকাননি। জোটের বহু মঞ্চে তথাকথিত টোকাই রাজনীতিরাও তাকে পাশ কাটিয়ে চেয়ার দখলের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছেন। তাকে কখনো দেখি নাই সেই নোংরা খেলায় অংশগ্রহণ করতে। জোটের প্রদান বিরোধী দল বিএনপির অনেক পিয়ন-চাপরাশি পর্যায়ের নেতাকেও দেখেছি তাকে অবহেলা করতে। কিন্তু ওনাকে দেখি নাই প্রতিশোধ পরায়ন হতে। এতটাই ভদ্র ও নিরঅহংকার মানুষ ছিলেন তিনি।

২০ দলীয় জোটের শরিক হিসাবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতৃত্ব দিয়েছেন দীর্ঘ সময়। সে সময়টাতে খেলাফত মজলিশ ও ইসলামী মোর্চার দুই নেতা তাদের দলে যোগদান করলে একদিন হাসতে হাসতে বলেছিলাম, হুজুর জমিয়ত ভাঙ্গার সময় হয়ে গেছে। তিনিও মুচকি হেসে আমাকে স্নেহের সুরে বলেছিলেন, সমস্ত ফয়সালা আল্লাহ পাকের। সেদিন হাসতে হাসতে আমি কথাটা বললেও জমিয়তে ভাঙ্গন ধরতে খুব বেশি দেরি হয় নাই। অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘ সময়ের সহযোদ্ধারাই তাকে জমিয়ত থেকে দূরে ঠেলে দেবার সবস্ত পক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন। তবে, জোটের প্রধান শরিক বিএনপির দুয়েকজন শীর্ষ নেতা এই ভাঙ্গনের পেছনে ইন্দন দিয়েছেন। যা মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসকে আহত করেছিল। তারপরও তিনি ঐ নেতাদের বিরুদ্ধে কোন শব্দ উচ্চারণ করেন নাই। এখানেই ছিল মুফতি ওয়াক্কাসের মহত্ব।

যারা তাকে সেদিন অপমান করেছেন, তারাও কেউ অপমান থেকে মুক্তি পান নাই। পাবেন বলেও আমার মনে হয় না।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর আমরা ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করলেও মুফতি ওয়াক্কাসের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে নাই। যেখানে বা যখনই দেখা হতো, অত্যন্ত স্নেহের সাথে কথা বলতেন। জমিয়তে দুইতিনটা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণও দিয়েছেলেন। উপস্থিত হয়েছিলাম। আমার দলের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানিকে সম্মান ও স্নেহ করতেন।

গত ৪ নভেম্বর ২০২০ মুফতি ওয়াক্কাসের সাথে শেষ দেখা আমার। জমিয়তের ঐ অনুষ্ঠানে আমি ও এনডিপি মহাসচিব মো মঞ্জুর হোসেন ঈসা ছিলাম।

মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস অত্যান্ত সাদামাটা জীবন পরিচালনা করতেন। অনেকটা লৌকিকতামুক্ত জীবনযাপন করতেন। অত্যন্ত প্রখর মেধাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। রাজনৈতিক আলাপে সকল মতের মানুষের সাথে কথা বলতে বা আলোচনা করতেন সময় নিয়ে। নিজের মত যে কোনভাবে চাপিয়ে দিতেন না। আলোচনার মধ্য দিয়ে নিজের চিন্তা ও মতের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতেন। নিজের নীতি আর গতিতে আপনি ছিলেন অবিচল।

স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার মত সাহসী নেতৃত্বের অবসান হলো মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসের ইন্তেকালের মাধ্যমে। যা আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, দেশ ও রাজনীতির জন্য খুব ভালো বিষয় নয়। তাদের মত নেতৃত্বে শূন্যতার মধ্য দিয়ে যা হচ্ছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ। অযোগ্যরা যখন শূন্যস্থান পূরণ করে, তখন সমাজে আলোচনার দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। বিভাজন বৃদ্ধি পায়। যা সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতির জন্য কল্যাণকর নয়।

মানুষ ভুলত্রুটির উর্ধ্বে নয়। মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাসও হয়তো তার উর্ধ্বে নন। তবে, এমন মেধাবী, যৌক্তিক, ধীচিন্তার অধিকারী মানুষ সমাজে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেশ-জাতি ও দ্বীনের জন্য তার খেদমতগুলো কবুল করে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*