Main Menu

”ভালোমন্দে ভালো থেকো” – যাপিত জীবনের জলছবি।

Sharing is caring!

 

কবি তালুকদার রায়হান’র কাব্যগ্রন্থ – “ভালোমন্দে ভালো থেকো” – যাপিত জীবনের জলছবি

সাহিত্যের অন্যসব আঙ্গিক থেকে কবিতা আলাদা। কবিতা একটি সূক্ষ্মশিল্ল। পরিমিতিবোধের নিবিড় পরিচর্যায় গড়ে ওঠে কবিতা। নির্মাণকৌশলের কাছে বিষয় অনেকসময় গৌণ হয়ে দেখা দেয়। কবিতা কোনো বিষয়ের উপর প্রতিবেদন রচনা নয়, বরং পরোক্ষভঙ্গি কবিতার ভেতরে – বিষয়ের গভীরে প্রবেশে একটা আচ্ছাদন তৈরি করে। কবিচিত্তের ভাবনা শব্দগত রূপলাভ করলেই সকল রচনা কবিতা হয়ে ওঠে না। কবির চিন্তাপ্রসূত বিষয়ের স্বরূপ সকল সময় পাঠকের কাছে আবিষ্কৃত না-ও হতে পারে। পাঠক এর আশপাশ ঘিরে বিচরণ করতে পারেন। পাঠক কোনো কবিতা পাঠ করে একটা ভালোলাগার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হতে পারেন। কিন্তু কবি যে বিষয় নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন, পাঠক সেই বিষয় থেকে অনেক দূরের কোনো বিষয় ওই কবিতা থেকে আবিষ্কার করতে পারেন। অথচ, কবিতার বিষয় নিয়ে এত বিচিত্রমাত্রার রহস্য থাকলেও পাঠককুল অনেকসময় কবিতার বিষয়-অনুসন্ধানী হয়ে ওঠেন। কারণ কবিতার আঙ্গিকের সাথেসাথে কবিতার বিষয়ও পাঠকের কাছে অনেকসময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই নিরিখে “ভালোমন্দে ভালো থেকো” কাব্যগ্রন্থে – সহজবোধ্য বিষয়সম্পন্ন শিল্পমান-উত্তীর্ণ কবিতা নির্মাণে কবি তালুকদার রায়হান’র মুন্সিয়ানার ছাপ পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।

আইয়ুব আল আমিন’র নন্দিত প্রচ্ছদে, মানসম্পন্ন অফসেটে মুদ্রিত পরিবার পাবলিকেশন্স থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ প্রকাশিত মোট চুয়ান্নটি কবিতা – সংবলিত এই গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তার সত্তার স্বত্বাধিকারী বাবা-মাকে।
(গ্রন্থে স্বত্বাধিকারী বানানটি ভুল আছে)
বইটি দেখলেই হাতে তুলে নিতে ইচ্ছে করে। এর কাব্য-আলোচনা করতে গেলে শুরু করতে হয় শেষ থেকে। গ্রন্থের শেষ কবিতা – “ভালোমন্দে ভালো থেকো” – স্মৃতিকাতর কবির হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো (যদিও একবিতায় কবি তা অস্বীকার করেছেন) উচ্চারণ –
“কালের স্রোতে ভেসে ভেসে বদলে গিয়েছো নিশ্চয়ই। হয়তো আগের মতো গলা ছেড়ে তালবেতালে গান গাওয়া হয় না। এই উড়নচণ্ডী মানুষটার পেছন কাঁধে মাথা রেখে গগনচুম্বী স্বপ্নের ইতিবৃত্ত শোনানোর ইচ্ছাও জাগে না। সময় বদলে দেয় সব – কথাটা কি ঠিক?- প্রশ্নটা আগের মতোই তোলপাড় করে ভেতরে। তাই আর ডিজিটাল হতে পারিনি, এনালগ ভুবনেই শুনি মনের আবাহনী।”

কবি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তার বস্তুগত ও ভাবগত অনুভূতিকে – আবেগবিবর্জিত সমসাময়িক কালের প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের সাথে একতারে বাঁধতে পারেননি। বলাবাহুল্য, এজন্য তিনি মোটেই হতাশ নন, বরং তিনি আনন্দিত এই ভেবে যে, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজের মানুষেরা পরাধীন, সময়ের বিবর্তনে এবং বয়সের সাথেসাথে সামাজিক মানুষেরা নিজের চারদিকে যে একটা ভব্যতার প্রাচীর গড়ে তোলেন, তিনি নিজেকে সেই পরাধীনতার ঘেরাটোপে বন্দি করেননি। তিনি তার ইচ্ছেকে রেখেছেন স্বাধীন — সর্বগামী।
কবির ভাষায় –
“ভালোবাসি কারণে-অকারণে খেপে গিয়ে মাঘের কনকনে শীতে উদোম গায়ে ঘাসের বুকে গড়াগড়ি দিতে; চৈত্রের আগুন লাগা দুপুরে চায়ের গরম পেয়ালায় চুমু দিয়ে উষ্ণ ঠোঁটগুলো শীতল করতে।”
পেছনকাঁধে, রাতজাগা, উদোমগায়ে, আগুনলাগা, অনেকক্ষেত্রে – শব্দগুলো একসাথে হবে, কবিতায় আলাদাভাবে লেখা হয়েছে।

শেষ কবিতার ঠিক আগের কবিতা ‘পোড়া বাঁশি’। কবিতাটি শুরু হয়েছে চমক দিয়ে – সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায়!
“আমি জখন এক্কেবারে হুরু হাপপেন পিন্দি …
ও আইচ্ছা, আপনি তো আবার ছিলটি ভাষা বুঝবেন না অতোটা!”
এই দু’টি চরণের মধ্য দিয়েই কবির জন্মস্থানের জনগণের ভাষার প্রতি মমতা ও দায়বদ্ধতা সুন্দরভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। কবিতাটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত।

“হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে টোকা পড়তেই মা বললেন – হরিদাস দাদানি?
ওপাশে কুকুরের ঘেউ ঘেউ, ঘরের এপাশে আতঙ্কের উত্তাল ঢেউ;
আমি বললাম – মা দরজা খুলবো?
পিদিম নিভিয়ে ফিসফিসিয়ে মা বললেন – খবরদার!
কয়েকটা বুটের শব্দ
কয়েকটা শুয়োরের উর্দু চেঁচামেচি,
সেই সাথে বিকট একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম –
শুনতে পেলাম বাবার বজ্রকণ্ঠে –
জয় বাঙলা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাছুলউল্লাহ!”
উল্লিখিত চরণে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদারদের বীভৎস হত্যাযজ্ঞের মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে। আরেকটি বিষয়ের প্রতি আমি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হলো, যে ‘জয় বাঙলা’র গায়ে সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোকেরা রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের নিকৃষ্ট কৌশল হিসেবে বরাবরই একটি সাম্প্রদায়িক তকমা লাগাতে চেয়েছে, পাক-সেনাদের গুলিতে মৃত্যুর ক্ষণে সেই ‘জয় বাঙলা’ আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাছুলউল্লাহ’ — একইসাথে উচ্চারিত হয়েছে। এটিই ইতিহাস।
“হঠাৎ মা আমাকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বটি নিলেন হাতে,
তীব্রবেগে দরজা খুলেই হুঙ্কার দিলেন — শুয়োরের বাচ্চা!
খাকি ড্রেসওয়ালারা তখন ফিরে যাচ্ছিলো, মায়ের হুঙ্কার শুনে অট্টহাসির উলুধ্বনি দিলো অমানুষের দল!
তাদের একজন বলে উঠলো –
ইয়ে দ্যাখরে মা দুর্গা আগেয়া, চল জশান বানালে!”
বাংলার চিরায়ত নারীও যে প্রয়োজনে রুদ্রমূর্তি ধারণ করতে পারেন, সাহসের সাথে শত্রুর মোকাবেলা করতে পিছপা হন না – এই ভাবনাটি সুন্দর ভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। এখানে ‘উলুধ্বনি’ শব্দটি অনেকের মনে দ্বিধা সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, এটি একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মঙ্গলধ্বনি। কিন্তু এই শব্দটি এখানে উপমা কিংবা কল্পচিত্র নয়, বাস্তবচিত্র। পাক হানাদাররা উলুধ্বনির মতো শব্দ করেই হেসেছে। তার প্রমাণ মেলে তাদের উক্তি থেকেই – “ইয়ে দ্যাখরে মা দুর্গা …”।

আলোচ্য কবিতায় কবি ‘হরিদাস’ চরিত্রের মধ্য দিয়ে আরেকটি সত্য প্রকাশ করেছেন, তা হলো স্বাধীনতা – পূর্বকালে এই ভূখণ্ডের মানুষেরা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে একটি অসাম্প্রদায়িক পরিমণ্ডলে জীবন অতিবাহিত করেছেন, একসাথে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে, নিজদেশে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হয়ে দেশত্যাগী হয়েছেন।
কবির ভাষায় –
“আসমানে সূর্য উঠে প্রতিদিন, রক্তিম সূর্য,
অবারিত সবুজে অবুঝ মন খুঁজে বেড়ায় সেই কিশোরটাকে
যেই কিশোরটা স্টেইনগানের গুলিতে পাকি শুয়োরের বুক ঝাঁঝরা করে দিয়ে ভাবতো –
হরিদাস কাকা আর সে, দুজনেই সমানে সমান এই মানচিত্রে।
অথচ, সেই হরিদাস কাকার শবদাহ কোথায় হয়েছে জানেন (?) – ইন্ডিয়ায়!” (এখানে ‘উঠে’-স্থলে, ওঠে হবে, কারণ এটি সমাপিকা ক্রিয়া। হরিদাসদাদা, হরিদাসকাকা, ঘেউঘেউ, কিশোর-চোখ, না-দিতে শব্দগুলো একসাথে হবে। প্যান্ট হবে, ট-এর সাথে যুক্ত হলেও বিদেশি শব্দের কারণে এখানে ‘ণ’ হবে না।)
যদিও কবির জন্ম মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েকবছর পর, তবু মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করে সেই অনুভূতিকে সকলের করে প্রকাশ করতে পারা সহজসাধ্য বিষয় নয়। এখানেই কবি সার্থক। এই কবিতাটি কালের সাক্ষী হয়ে কালের খেয়ায় দখল করে নেবে স্থান, এই আশা করাই যেতে পারে।

‘সংবিধান সাংঘর্ষিক প্রেম’ কবিতায় মানব-মানবীর প্রেম-সম্পর্কের মোড়কে উঠে এসেছে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কিছু অসংলগ্ন চিত্র। এখানে কবি অসামান্য নিপুণতায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি সময়কে ধারণ করেছেন কবিতায় –
“আমাদের স্ব স্ব জগতে বড্ড অহমের মহিমা
মন তাই মন বুঝেও হয়েছে অকর্মা!
জীবনের বক্ররেখা যতই বক্র হোক
দূরত্ব আজ খুলে দিয়েছে তৃতীয় চোখ।
… … … … … … … …
ক্ষোভের দাবানলে পুড়ে মনের জমিন!
একদিকে সংবিধানবিরোধী তোমার দাবিদাওয়া,
অন্যদিকে, আমার সংবিধান রক্ষায় অনড় থাকা,
প্রেমের সংবিধানকে করেছে সাংঘর্ষিক,
হৃদয় রাষ্ট্রকে করেছে ক্ষতবিক্ষত
চাওয়া পাওয়ার সূর্যটাকে করেছে অস্তমিত।”
(পুড়ে-স্থলে হবে পোড়ে। স্ব-স্ব, হৃদয়-রাষ্ট্র শব্দগুলো এভাবে লিখলে পাঠোদ্ধার যথাযথ হয়।)

‘পিতা’ কবিতায় কবি জন্মদাতার উদ্দেশে বলছেন,
“প্রথম চিৎকার হতে শেষ শব্দ অবধি
যা কিছু আমার, যা হবে আমার,
যা রবে আমার, অর্ধেক হিস্যা তোমারই।
পিতা, তুমি এই অদ্ভুত সত্তার স্বত্বাধিকারী।”
কবিরা দেখতে সাধারণ মানুষের মতো হলেও, সাধারণের কাছে তারা কিছুটা অদ্ভুতই বটে। কবির স্থাবর-অস্থাবর সবকিছুর অর্ধেক হিস্যা পিতার। সাধারণের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে অর্ধেক কেনো! পুরোটা কেনো নয়! এখানেই কবিরা সাধারণের চেয়ে আলাদা, তিনি আবেগের আতিশয্যে জননীর কথা ভুলে যাননি, বাকি অর্ধেকের স্বত্বাধিকারী যে তিনি।
এই কবিতায় কিছু সংখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন –
“ন’হাজার পেন্সিলের শিষ”, “আটশ দিয়াশলাইয়ের বারুদ”, ছিয়াত্তরটি মোমবাতির মোম”। আমি জানি না এই সংখ্যাগুলো কেনো ব্যবহার করা হয়েছে, নিশ্চয়ই কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে।
যেমন আফ্রিকার কবি বেঞ্জামিন মলয়েস লিখেছিলেন, “আড়াই লক্ষ খনিতে কালো কয়লা পুড়ছে, নিশ্চয়ই আলোকিত হবে আফ্রিকা।” দক্ষিণ আফ্রিকার নিগৃহীত কালো মানুষের পরিবারের সংখ্যা ছিলো আড়াই লক্ষ, প্রতিটি পরিবার একেকটি খনি আর প্রতিটি মানুষ যেনো নিপীড়নের অনলে পুড়তে পুড়তে কালো কয়লা।
কিংবা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন লিখেছেন, “বিশ্ব-সংসার তন্নতন্ন করে খুঁজে এনেছি, একশ’ আটটি নীলপদ্ম।”
রাবণের সাথে যুদ্ধে জয়লাভের জন্য দেবী দুর্গাকে তুষ্ট করতে ১০৮টি নীলপদ্ম’র প্রয়োজন পড়েছিলো, বরুণার জন্য কবি সেই অসাধ্য সাধন করেছেন, সেটি বুঝাতেই এই সংখ্যাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এখানেও এমন কোনো কারণ থাকতে পারে যা অনাবিষ্কৃত।

‘স্বাধীনতার পরিসুখ’ কবিতায় স্বাধীনতার বিবিধ-রূপ বিধৃত হয়েছে। প্রয়াত সঙ্গীতজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল-কে উৎসর্গীকৃত এই কবিতার শুরুটি অত্যন্ত চমৎকার – সহজবোধ্য চিত্রকল্পে মোড়া।
“ত্রিশ লক্ষ ফুল গিয়েছিলো বলে ঝরে
নৌকা তুলেছে পাল
ইছামতি, বুড়িগঙ্গা, সুরমা নদীর তীরে;
সবুজ সম্ভ্রম খেয়েছিলো বলে নেড়ি কুকুরে
সোনালি ধান দিন দিন পাচ্ছে প্রাণ
অবারিত সবুজের মুক্ত বুক চিঁড়ে।”
বানানবিভ্রাট ঘটেছে, যেমন: চিরে, ইছামতী, পরান হবে। দিনদিন একসাথে হবে। ‘দৈন্যতা’-স্থলে দৈন্য বা দীনতা হবে। তাছাড়া কী-স্থলে বারবার ‘কি’ লেখা হয়েছে।

‘বৃত্তবন্দী’ কবিতাটি এরকম —
“হৃদপিণ্ডের ক্রমাগত ঝাঁকুনিতে
মড়মড় করে নড়ে দুশো ছয়টা হাড়
গড়বড় হয়ে যায় ব্যাসার্ধের পরিমাপ
বৃত্ত ভুলে পেতে চাই জাগতিক সুখ!
জ্যামিতিক কম্পাস খুঁড়ে মাটির বুক।”
গ্রন্থের অন্যান্য কবিতার চেয়ে এই কবিতার নির্মাণকৌশল সতন্ত্র। এখানে সময়ের সাথেসাথে মানবদেহের পরিবর্তিত রূপের চিত্রকল্প মিশে গেছে মানবমনের চিরায়ত আকাঙ্ক্ষার সাথে – সর্বোপরি বস্তুগত চেতনার সারোৎসার কবিতাটিকে পৌঁছে দিয়েছে উচ্চমার্গে।
হৃদপিণ্ড একটি ভুল শব্দ, হবে হৃৎপিণ্ড। ‘খুঁড়ে’ এখানে সমাপিকা ক্রিয়া হওয়ার কারণে হবে ‘খোঁড়ে’।

‘ফেরারি সম্বেদন’ কবিতায় স্মৃতিকাতরতা আর দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি হৃদয়ের অনিবার্য টান এবং গভীর মমত্ববোধ মূর্ত হয়ে উঠেছে।
“উড়ে যাই সবুজ ধানক্ষেত পেরিয়ে
উদনা গাঙের তীরে হাঁসছানাদের ভিড়ে
বালিকার হাসির ঝিলিক
যেখানে বিকেলের সোনারোদে ঝরে।
রাণী এলিজাবেথের রাজ্যে
সিগন্যাল বাতি সবুজ হলেই দেখি,
মায়ের পরনে এখনো ব্লাউজ ছাড়াই আটপৌরে শাড়ি
নির্বাসিত চোখে জ্বলে ওঠে ভালোবাসার লালবাতি!
একফোঁটা কুসুম গরম জল হয়ে যায় ফেরারি…”
কবিতাটির শিরোনামে ভুল শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, শব্দটি হবে ‘সংবেদন’। ‘কুসুমগরম’ একটি সমাসবদ্ধ শব্দ, আলাদা হবে না। ‘মুহুর্ত’ হবে ‘মুহূর্ত’। ‘রাণী’ এবং ‘ক্ষেত’র প্রমিত বানান যথাক্রমে ‘রানি’, ‘খেত’।

‘কাকের গঞ্জে কবি’ কবিতাটি জুড়ে রয়েছে আক্ষেপ, সমাজের প্রতি ক্ষোভ। এসমাজে নিকৃষ্টদেরই জয়জয়কার। এখানে অগ্রসর চেতনার মানুষেরা মূল্যহীন। সবকিছু চলে যায় নষ্টদের দখলে। এখানে যোগ্যতার যথোচিত কদর হয় না। অযোগ্যরা দখল করে নেয় উচ্চাসন।
“কাকের গঞ্জে বসে উন্মুক্ত মেলা!
খুন হয় কলম,
চেয়ে চেয়ে দেখে কবি –
কাক চড়ে বেড়ায় নাগরদোলায়!”
(কবিতায় –“লাকড়ির চুলায় পড়ায় মালা” এখানে হবে ‘পরায়’।)

‘অসমাপিকা’ কবিতায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অসীম রহস্য উদঘাটনে ব্যস্ত মানুষদের নিয়ে কবির আক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে। এই পৃথিবীতেই লুকিয়ে আছে বিলুপ্ত সভ্যতার অজানা কতো রহস্য। হয়তো কোনোদিনই কেউ তা জানতেও পারবে না। অথচ মানবকুল এসব ছেড়ে মহাজাগতিক অন্বেষণে ব্যস্ত।

‘শ্রেষ্ঠ ওঝা’ এবং ‘কষ্ট আয়েশী’ (সঠিক বানান আয়েশি) কবিতায় কবির চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাস প্রতিফলিত হয়ে উঠেছে। এই আত্মবিশ্বাসটুকু একজন কবির জন্য জরুরি।
গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘আয়েন্দা’। ফারসি শব্দ ‘আইন্দা’ থেকে ‘আয়েন্দা’ শব্দের উৎপত্তি। শব্দটির অর্থ হচ্ছে ভবিষ্যৎ। এই কবিতায় কবি পৃথিবী নামক গ্রহের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।

“ইমেইল আগ্রাসনে বিকলাঙ্গ রানার,
ভার্চুয়াল জগতের জয়গানে
তৈয়ব চাচার হুক্কার টিকি শেষ!
… … … … … …
হয়তো জয় হবে এলিয়েন,
একদিনে হবে ষোলটি সূর্যাস্ত,
অনলাইন পোর্টালে জন্মাবে
নতুন কোনো এক দিগন্ত,
ষোলটি ঊষার আলোয় উদ্ভাসিত হবে না
তোমার ইলেক্ট্রনিক অনুভূতি!”

গ্রন্থের প্রায় কবিতায়ই জন্মভূমির প্রান্তিক জনগণের আটপৌরে জীবনের বিভিন্ন অনুষঙ্গ এবং কবির প্রবাসে থাকার সুবাদে সেখানকার জীবনবাস্তবতার বিবিধ উপাত্তের সম্মীলন ঘটেছে — যা কবিতাগুলোকে স্বাদ্য করে তুলেছে।
কবির কবিতার বিষয় অনুসন্ধান সহজসাধ্য – তবে সবসময় নয়। কিছুকিছু কবিতার বিষয়রহস্য উন্মোচন গভীর অনুধ্যান দাবি করে। কবিতাগুলোর পরতে পরতে অঙ্কিত হয়ে আছে কবির ছন্নছাড়া বোহেমিয়ান জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার জলছবি।

“ভালো থাকা এক মহা কঠিন কাজ। আমি কঠিনের সাথে বরাবরই পাঞ্জা লড়তাম, এখনো লড়ে যাই। মনকে বুঝে নিও, বাইবে না আর দুঃখের মই, বলবে না আর — আসলেই কেউ সুখী নই!

পুনশ্চ: ভালোমন্দে ভালো থেকো।”

কমলকলি চৌধুরী, লেখক ও অধ্যাপক।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*