Main Menu

বিন বাদীস : আলজেরিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অগ্রপথিক

Sharing is caring!

১৮৩০ সাল। ফ্রান্স অতর্কিত হামলা চালিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে প্রবেশ করে আলজেরিয়ায়। সেখানে শুরু করে ভয়াবহ ধ্বংসতান্ডব। অতর্কিতভাবে হত্যা করে হাজার হাজার আলজেরিয়ান জনগণকে। ধীরে ধীরে তারা আলজেরিয়াকে পুরোপুরি দখলে নিয়ে নেয়। আলজেরিয়ার জনগণের ওপর চাপাতে থাকে ফরাসি সংস্কৃতি। আলজেরিয়ার দীর্ঘদিনের ইসলামী তাহজীব-তামাদ্দুন, শিক্ষা-সংস্কৃতি উপনীত হয় এককবারে নিঃশেষের ধারপ্রান্তে। ঠিক তখনই  মুসলমানদের তাহজীব-তামাদ্দুন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে এবং গোলমির শিকল থেকে  মুসলমানদেরকে মুক্ত করতে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মশাল হাতে নিয়ে ময়দানে নেমে এসেছিলেন আব্দুল হামীদ বীন বাদীস (র.)।

তাঁর পূর্ণ নাম-আব্দুল হামীদ বিন মুস্তফা বিন মক্কী বিন বাদীস। তিনি বিন বাদীস নামেই পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ছিলেন একজন আলজেরিয়ান শিক্ষাবিদ, মুসলিম সংস্কারক, গবেষক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আব্দুল হামীদ বিন বাদীস আলজেরিয়ার কনস্টান্টাইন শহরে ১৮৮৯ সালের ৪ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খুব সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবার ও জিরি রাজবংশের সন্তান ছিলেন। তাঁর কোনো কোনো পূর্বপুরুষ আফ্রিকার শাসনকর্তাও ছিলেন। তাঁর পিতামহ মক্কী বিন বাদীস ছিলেন একজন কাজী (বিচারক)। তাঁর বাবা মুহাম্মদ বিন মুস্তফা ছিলেন একজন সহকারী বিচারক ও উপনিবেশিক পার্লামেন্টের অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিনিধি। বিন বাদীস ছিলেন ধার্মিক পরিবারের সন্তান। তাঁর বেড়ে উঠাও ধর্মীয় পরিবেশে। ফলে খুবই অল্প সময়ে তেরো বৎসর বয়সে তিনি পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করে ফেলেন। বিন বাদীস কোরআন হিফজ করার পর তাঁকে ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলি ও আরবি ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাতে তার পরিবার তাকে ওই সময়ের সুবিজ্ঞ আলেম হামদান আল ওনায়সির কাছে প্রেরণ করেন। অল্প সময়ের মাঝেই বিন বাদীস ইসলামের মৌলিক জ্ঞান ও আরবি ভাষা শিখে ফেলতে সক্ষম হোন। বিন বাদীসের কাছে হামদান আল ওনায়সি শুধু একজন সাধারণ শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিন বাদীসের কাছে একজন বৈপ্লবিক ও সচেতন নেতা। বিন বাদীসের তরুণ সময়েই তিনি তাঁর মাঝে বিপ্লবের বীজ বপন করে দিয়েছিলেন। বিন বাদীস তাঁর এ গুরুর একটি বাণী আজীবন মনে রেখে ছিলেন। তিনি বাদীসকে একদিন বলেছিলেন, “learn knowledge for the sake of knowledge, not for the office.” অর্থ, ‘জ্ঞানের খাতিরে জ্ঞান শেখো, পদ-পদবীর জন্য নয়।’ হামদান আল ওনায়সি ছিলেন কনস্টানটাইনের মুসলমানদের অধিকার আদায়ের অদমনীয় বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি বিন বাদীসকে ফ্রান্স সরকারের সাথে কস্মিনকালেও কোনো ধরনের সমঝোতা বা গোলামি না করার শপথ নিয়েছিলেন। বিন বাদীস আমৃত্যু  ধর্মীয় ও রাজনৈতিক  যে কোনো ইস্যুতে তার এ তরুণকালের শিক্ষাগুরুর শরণাপন্ন হতেন।

১৯০৮ সালে বিন বাদীস উচ্চশিক্ষার জন্য তিউনিসিয়াই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর সেখানে গিয়ে জায়তুনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষায় মনোযোগী হোন। তৎকালীন সময়ে জায়তুনা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সবচেয়ে গুণগত মানসম্মত  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে ছিল অতুলনীয়। এখানে ভর্তি হওয়ার পরই মূলত বিন বাদীসের চোখ-কান খুলতে থাকে। তিনি জ্ঞানের বিস্তর সাগরে ভাসতে থাকেন। আরবি ভাষা ও  ইসলামী নানা বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা করেন। এসময়ে তিনি অসংখ্য জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করেন। শায়খ মুহাম্মদ আল-নাখালী আল-কায়রোয়ানী, শায়খ মুহাম্মদ আল-তাহির বিন আশুরের মতো আলেমদের নিকট থেকে তিনি তখন জ্ঞান অর্জন করেন। ১৯১২ সাল পর্যন্ত তিনি জয়তুনাতে লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করার পর আলজেরিয়ায় নিজ শহর কনস্টানটাইনে ফিরে যান। নিজ শহরে ফিরে এসে একধরনের অনানুষ্ঠানিক  শিক্ষকতা তিনি শুরু করেন। শহরের জামে আখরাজ মসজিদে ফজরের পর ছোট-ছোট বাচ্চাদের নিয়মিত পড়ানো শুরু করেন। কিছুদিন পর  মাগরিবের পর বয়স্কদেরকেও পড়ানো শুরু করেন।

১৯১৩ সালে তিনি  হজ্ব আদায় করার উদ্দেশে হিজাযে সফর করেন। সে সময় হিজায ও হিজাযের বাইরের অনেক আলেমদের সাথে তার সাক্ষাৎ ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। এ সফরে তিনি দেশ-বিদেশের বহু আলেমের দরসেও বসেছেন এবং তাদের সাহচর্য লাভ করেছেন। ওই সময় আলজেরিয়ার বিখ্যাত আলেম শায়খ বশির ইব্রাহিমী  এবং মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (র.)-এর সাথেও সাক্ষাৎ হয়। তখন তাঁর উস্তাদ শায়খ উনায়সিও এ সফরে ছিলেন। তিনি তাকে মদীনায় সফরের পরামর্শ দিলেন। তখন বিন বাদীস তার সার্বিক বিষয়ে হুসাইন আহমেদ মাদানী (র.) এর সাথে পরামর্শ করলে তিনি তাঁকে দেশে ফিরে গিয়ে জনমানুষের জন্য কাজ করার পরামর্শ দেন। ১৯১৪ সালে হুসাইন আহমাদ মাদানী (র.)-এর পরামর্শকে গ্রহণ করে তিনি আলজেরিয়ায় ফিরে আসেন। আলজেরিয়ায় ফিরে আসার পর তিনি  মনে করলেন, এ নিষ্পেষিত জাতিকে ফ্রান্সের গোলামির শিকল থেকে মুক্ত করতে হলে  একদম গোড়ায় হাত দিতে হবে। মুসলমানদের সন্তানদের মনমগজে ইসলামকে  পুতে দিতে হবে। এ কারণে  তিনি  ইসলামী তাহজীব-তামাদ্দুন, শিক্ষা-দীক্ষার প্রচার-প্রসারে আগের তুলনায় আরো ব্যাপকভাবে মনোযোগী হলেন।

১৯২৫ সাল থেকে আশশিহাব নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করলেন। পত্রিকাটিতে তার  শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক চিন্তাধারা, সমসাময়িক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। ১৯২৬ সালে  গড়ে তুলেন  প্রাথমিক আরবি শিক্ষা অফিস নামে একটি শিক্ষা অফিস। যার অধীনে ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাদরাসাতু জামেইয়্যাতুত তারবিয়্যাহ ওয়া তালিমিল ইসলামিয়্যাহ’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরবর্তীতে পুরো আলজেরিয়ায় যার একশো সত্তরেরও বেশি শাখা গঠন হয়েছিল। যেখান থেকে হাজার হাজার মুসলিম শিশু  ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা অর্জন করে। ১৯৩১ সালে আলজেরিয়ার শীর্ষস্থানীয়  প্রায় ১০০ জন আলেম মিলে ‘জামেইয়্যাতুল উলামাইল মুসলিমিন আলজেরিয়া’ বা ‘দ্য অ্যাসোসিয়েশন অব আলজেরিয়ান মুসলিম উলামা’ নামক একটি জাতীয়  সংগঠন তৈরি করেন। তৎকালীন সময়ের প্রায় সব উলামায়ে কেরাম ও মুসলিম জনসাধারণ এ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিন বাদীস তখন সবার পরামর্শক্রমে এ সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হোন। সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সভাপতির শুভেচ্ছা ভাষণে তিনি বলেন, ‘ইসলাম আমাদের ধর্ম, আরবি আমাদের ভাষা, আলজেরিয়া আমাদের ঘর।’ সংগঠনটি তৎকালীন সময়ের আলজেরিয়ান মুসলমানদের মুখপত্র হিসেবে কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পূর্বপর্যন্ত আলজেরিয়ার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল এ সংগঠনটি।

১৯৩৬ সালে তিনি ফ্রান্সের সাথে একীভূত হওয়ার ধারণাকে ব্যর্থ করার জন্য ইসলামী সম্মেলনের ডাক দিয়েছিলেন। এ বৎসরই জুলাই মাসে তিনি আলজেরিয়ান প্রতিনিধি হিসেবে প্যারিস ইসলামী সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৩৭ সালের আগস্ট মাসে বজ্রকণ্ঠে ফ্রান্সের উপনিবেশিক  সংসদ বর্জনেরও আহ্বান করেছিলেন। তিনি সরাসরি তেমন লেখালেখি করেননি। কিন্তু জাতির সামনে যে সব আলোচনা ও তার গবেষণামূলক কথা বলতেন, পরবর্তীতে তার ছাত্ররা সেসব বিষয়ে কলম ধরেছেন। এজন্যই অনেকেই বলেন, বিন বাদীস কোনো কিতাব রচনা না করে গেলেও অসংখ্য ব্যক্তি রচনা করে গেছেন। তিনি নিজ শহর কনস্টানটাইনে ১৯৪০ সালের ১৬ এপ্রিল মঙ্গলবার সন্ধ্যায়  ইন্তেকাল করেন। জামে আখজার মসজিদের ছাত্ররা তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করে। আলজেরিয়ার রাস্তায় সেদিন মানুষের ঢল নেমেছিল। আলজেরিয়ার বিভিন্নপ্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ তার জানাযায় শরিক হয়েছিল। বিন বাদীস আলজেরিয়ান জনগণকে গোলামির  জিঞ্জির থেকে মুক্ত করতে বুদ্ধিবৃত্তিক যে লড়াই করেছেন তা আলজেরিয়ার জনগণের মাঝে সারা জীবন অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। যে মহান নেতা তাঁর সারা জীবন তার দেশের মানুষের মুক্তির লক্ষে কাজ করে গেছেন সে মহান নেতাকে তাঁর দেশের মানুষ ভুলে যায়নি। তারা তাঁর অবদানকে জাতির সামনে তুলে ধরতে ২০১৮ সালে আলজেরিয়ার ওরান শহরে আনুমানিক ১৩ বিলিয়ন আলজেরিয়ান দিনার ব্যয় করে ‘আব্দুল হামিদ বিন বাদীস মসজিদ’  নামে একটি মসজিদ তৈরি করেছে।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*