Main Menu

ফেসবুক গুগলের দাপট থেকে সাংবাদিকতা রক্ষায় উপায় কী?

Sharing is caring!

আজ থেকে বহুদিন আগে, গত মাসে অস্ট্রেলিয়া সরকারের সঙ্গে গুগল ও ফেসবুকের মুখোমুখি অবস্থানের বহুদিন আগে, ইন্টারনেটে ব্যবসাটা কীভাবে হবে তা নিয়ে কারো কাছে ঠিকঠাক কোনো মডেল ছিল না। পুরনো সেই সময়ের কথা এখন ভুলে গেছে প্রায় সবাই।

ইন্টারনেটের উত্থানের সেই সময়টাতে সবকিছুর পরও একটা প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল, তা হলো এই ডট-কম নিয়ে আসলে হবেটা কী। এমন এক সময়ে গুগল আর ফেসবুক ইন্টারনেটে ব্যবসার এক গুপ্তধনের সন্ধান পেল। এ প্রতিষ্ঠান দুটির হাতে তখন সবচেয়ে বড় যে সম্পদ ছিল তা হলো ব্যবহারকারীর তথ্য। এই তথ্যভান্ডারকেই তারা বানিয়ে ফেলল সোনার ডিম পাড়া এক হাঁসে। এর ফলে বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে বিরাট এক পরিবর্তন চলে এলো; যেখানে টেলিভিশন বা ছাপা পত্রিকার চেয়ে অনেক কার্যকরী উপায়ে নির্দিষ্ট ভোক্তার উদ্দেশে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করতে পারা শুরু হলো।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিজ্ঞাপনের এ নীতি, সমাজে তার প্রভাব এবং আদৌ এ ধরনের বিজ্ঞাপননীতির অনুমোদন থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে অনেক কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, তা হলো- বাণিজ্যিক দিক থেকে এটা পুরোপুরি সফল। এ বাজারের বিজ্ঞাপনের আয়ের প্রায় পুরোটাই দখলে রেখেছে গুগল ও ফেসবুক। আর তার ফলেই এ প্রতিষ্ঠান দুটি এখন ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছে। এরা এখন এতটাই শক্তিশালী যে অনেক দেশের সরকারকেও কোনো কাজে বাধ্য করে ফেলতে পারে।

অনুসন্ধান (সার্চ) এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে গুগল এবং ফেসবুক একচেটিয়া আধিপত্য অর্জন করেছে। এ কারণে কেনো বিষয়ে তাদের সঙ্গে দর কষাকষিতে যাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর চেয়েও খারাপ ব্যাপারটা হলো নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি না করে গড়ে ওঠা এই ব্যবসায়িক মডেলের জন্য সাংবাদিকতায় স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্য তো দিতে হচ্ছেই, সঙ্গে বহু তথ্য তাদের হাতে তুলে দেওয়ার কারণে অন্যদেরও এর মূল্য দিতে হচ্ছে। এসবের কারণে আমরা দ্বৈত বাজার ব্যর্থতায় ফেঁসে আছি, যা কেবল বিজ্ঞাপন ব্যবসারই ক্ষতি করছে না, ক্ষতি করছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারও।

এ সমস্যার মুখে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকার যা করল তা হলো- তারা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলোর জন্য একটা আইন করে দিল, তাদের দেশে ব্যবসা করতে হলে সেখানকার সংবাদ প্রকাশকদের সংবাদের জন্য অর্থ দিতে হবে। একইসঙ্গে তারা কিছু পদক্ষেপের কথাও জানাল, যার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বিক্রির পথটা আরও স্বচ্ছ হয় এবং তাদের অ্যালগরিদমিক কিছু পরিবর্তনের কথাও বলা হলো, যা খবরের ব্যবসার জন্য ফলপ্রসূ হয়। অস্ট্রেলিয়া সরকারের এমন প্রতিক্রিয়ার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো- সাংবাদিকতা এবং বিজ্ঞাপনের এই বাজার ব্যর্থতার সমাধানে বাজার আধিপত্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

সমস্যার সমাধানে অস্ট্রেলিয়া সরকার পুঁজিবাদী সমাধানের পথে গেলেও তথ্য প্রযুক্তির শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এ পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে। গুগল ও ফেসবুক নয়া ডিজিটাল নিয়মকানুনের সমর্থনের কথা বলে এলেও যখনই একটা দেশের সরকার কিছু নিয়মকানুনের প্রস্তাব করল, সেসব নিয়মকানুন তাদের ব্যবসার বর্তমান মডেলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাল প্রতিষ্ঠান দুটি।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের নতুন আইনের কারণে গুগল প্রথমে অস্ট্রেলিয়ায় তাদের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিল, আর ফেসবুক বলেছিল তারা অস্ট্রেলিয়ায় সমস্ত খবরের লিংক ব্লক করে রাখবে (এ অবস্থান থেকে কিছুটা পিছু হটেছে দুটি কোম্পানিই)। মহামারির মতো একটা সময়ে একটা মিডিয়া ডিস্ট্রিবিউটরের কাছ থেকে তথ্য ব্লক করার মতো জঘন্য সিদ্ধান্ত আসার ব্যাপারটিকে যদি ধর্তব্যে নাও নেওয়া হয়, তারপরও প্রতিষ্ঠান দুটির কোনোটির সিদ্ধান্তই দীর্ঘমেয়াদে যুতসই না। ডিজিটাল নিয়মকানুনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ব্যবহারকারীকে তার তথ্য পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়, তাহলে তারা নিজেদের আকর্ষণ হারাবে।

অস্ট্রেলিয়া যে পথ বেছে নিয়েছে তা ভালো কোনো জননীতিকে চিত্রিত করে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার এই ‌‘নিউজ মিডিয়া বার্গেইনিং কোড’ সোশ্যাল প্ল্যাটফরমগুলো থেকে খবরের প্রকাশকদের হাতে অর্থকড়ি ফিরিয়ে ‍আনার বেশ সহজ ও সম্ভাবনাময় একটা পথ।

অস্ট্রেলিয়াতে আগেও এ ধরনের বাধ্যবাধকতা প্রয়োগের নজির রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সরকার যে পথে এগিয়েছে সেখানে তিনটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে, একই ধরনের নীতি অন্য কোনো দেশ নেওয়ার আগে, এটা তাদের মাথায় রাখা জরুরি।

প্রথমটা হলো- উদ্ভূত সমস্যা আদালতের বাইরে সমাধানের যে পথ রাখা হয়েছে তাতে ছোট প্রকাশক, খবর সংক্রান্ত বাণিজ্যের নতুন নতুন মডেল নিয়ে আসা কোম্পানি ও সংগঠনের চেয়ে বড় প্রকাশকরাই লাভবান হবেন। অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় প্রকাশকদের মধ্যে রয়েছেন রুপার্ট মুরডক, যিনি নতুন আইনের অন্যতম বড় সুবিধাভোগীও হবেন।

নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সর্বজনীনভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতার বদলে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রগুলো সাধারণত তাদের নিজেদের ও অংশীদারদের জন্য লাভজনক বিষয়গুলো নিয়েই আগ্রহ দেখায়। অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল প্ল্যাটফরমগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থ কীভাবে বণ্টন করা হবে সে বিষয়ে নতুন আইনে কিছু বলা হয়নি। ফলে শঙ্কা দেখা দিচ্ছে, ছোট স্টার্ট-আপ ও উদ্যোক্তারা শেষ পর্যন্ত এ সুবিধার বাইরেই থেকে যাবে।

অস্ট্রেলিয়া যেভাবে এগিয়েছে সেখানে দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো- এটা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম ও মিডিয়া অর্গানাইজেশনগুলোর মধ্যে ইচ্ছামাফিক চুক্তিতে আসতে অনুপ্রাণিত করবে। এর ফলে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী মিডিয়াগুলোকে ব্যবহার করতে পারবে। আমরা চাই না প্রকাশকরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম থেকে প্রাপ্ত অর্থের ওপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ুক, যে তারা ওই সমস্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

আর শেষটা হলো বিজ্ঞাপন ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যে বাজার ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া কোড এটাকে একটিমাত্র সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে; প্রকৃতপক্ষে এ দুটি ভিন্ন সমস্যা। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন বিদ্যমান পন্থায় একচেটিয়া দাপট দেখিয়ে গুগল ও ফেসবুক বাজারে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, তারা কোনো প্রকাশকের সঙ্গে লিখিত চুক্তিতে আসার প্রয়োজনীয়তা খুব সহজে এড়িয়ে যেতে পেরেছে। অস্ট্রেলিয়ার নতুন আইন হয়তো এ সমস্যাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু সংবাদ বাণিজ্যের চিরায়ত যে মডেল ছিল তা রাতারাতি ফিরিয়ে আনতে পারবে না। একইসঙ্গে ভুয়া তথ্য ছড়ানো থেকে শুরু করে ব্যবহারকারীর তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপের মতো সোশ্যাল-মিডিয়া প্ল্যাটফরমভিত্তিক ক্ষতিকর বিষয়গুলোও ঠেকাতে পারবে না নতুন এই আইন।

এর সহজ কিছু সমাধানও আছে। নিউজ-মিডিয়া ইকোসিস্টেমে ‌‘গুরুত্বপূর্ণ অবদান’ রেখেছে এমন অজুহাতে প্ল্যাটফরমগুলোর দায়মুক্তির সুযোগ রাখা উচিত হবে না সরকারগুলোর জন্য। নতুন আইনে সংবাদমাধ্যমগুলোর অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকতে হবে। ছোট সংস্থা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বাড়তি সুবিধার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

সরকার ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমগুলোর জন্য এক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত ও আশাব্যঞ্জক সমাধান আসতে পারে একটি মিডিয়া তহবিল গঠনের মাধ্যমে। স্বাধীন ও স্বচ্ছ উপায়ে এ তহবিল থেকে বিভিন্ন সংবাদপ্রতিষ্ঠানে তহবিল বরাদ্দ করা হবে। ফেসবুক আর গুগল যদি খবরের পেছনে শত শত কোটি ডলার নিয়ে দাঁড়াতে চায়, তবে জনস্বার্থের বিষয়টি সামনে রেখে একটি স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ সংস্থা গঠন করে তার মাধ্যমে ওই অর্থের বরাদ্দ হওয়া উচিত। এর মাধ্যমে নামি প্রকাশকরা তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন ও বাকিরা অপ্রয়োজনীয় সরকারি-বেসরকারি চাপ থেকে মুক্ত থাকবে।

অতিমাত্রায় প্রভাবশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে অস্ট্রেলিয়ান অভিজ্ঞতা সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য এক পা এগিয়ে দেওয়ার মতো একটি পদক্ষেপ। ফেসবুক ও গুগলকে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে আসতে হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকতায় যে সংকট তৈরি হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার নতুন আইন তার সমাধান দিতে পারে না। সাংবাদিকতার বর্তমান যে পরিসর তার চেয়ে বিস্তৃত পরিসরে গিয়ে এর সমাধান খুঁজতে হবে।

অনুবাদ : নাঈম ফেরদৌস রিতম।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*