Main Menu

জাফরুল্লাহকে ছাত্রদল নেতার ‘হুমকি’র নেপথ্যে কে?

Sharing is caring!

দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর রাজনৈতিক সম্পর্কে উভয় পক্ষ ওপরে হাসিমুখ দেখালেও ভেতরে ভেতরে যেন তুষের আগুন জ্বলছে। সপ্তাহ কয়েক আগে ‘বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী’ বলে পরিচিত জাফরুল্লাহকে এক ছাত্রদল নেতার হুমকি যেন সেই আগুনের তাপ ছড়াল। তবে সেই হুমকির ঘটনা কি একেবারেই আকস্মিক, নাকি ‘নেপথ্যে’ কেউ আছেন, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা।

বহুবছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষে কথা বলার জন্য এমনিতে বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। এর মধ্যে দুই-একজন যারা বিএনপির পক্ষে কথা বলেন তারাও আবার বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর আস্থাহীন। তাদের মধ্যে অনেকে প্রকাশ্যে সমালোচনা না করলেও গণস্বাস্থের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব সম্পর্কে জনসম্মুখে সমালোচনা করতেও পিছপা হন না। হোন তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান কিংবা মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অথবা সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তার মতো একজন সিনিয়র সিটিজেন ও বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়ার মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে দলের অবস্থান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়া হয়ে গেছে। আবার ছাত্রদল নেতার হুমকির পর বিএনপির দুটি অঙ্গসংগঠন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিপক্ষে প্রতিবাদ করায় প্রমাণ হয়েছে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে হুমকি দেয়ার পেছনে দলের সর্বোচ্চ নেতার ইন্ধন রয়েছে। তাই বিএনপির অন্য শীর্ষ নেতারা এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে পারছে না

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে জাফরুল্লাহ সমালোচনা করে গেলেও তারা এর বিপক্ষে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। কারণ তারা মনে করেন, দেশের একজন সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যেমন সরকারের সমালোচনা করেন তেমনি বিএনপিরও সমালোচনা করেন। তাতে বরং বিএনপির উপকারই হয়। এই জায়গা থেকেই গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জোট গঠনের মাধ্যমে বিএনপি ও জাফরুল্লাহর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। যেখানে দল হিসেবে বিএনপির অংশগ্রহণের পাশাপাশি সংগঠকের ভূমিকায় দেখা যায় জাফরুল্লাহকে।

এর মধ্যে গত ২৬ জুন জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেন বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ওমর ফারুক কাউসার। ওই সেমিনারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানে ‘সমালোচনা’ করে বক্তব্য রাখায় জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ওই ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘আপনি আমাদের নেতাদের নিয়ে কখনো কথা বলবেন না। যদি বলেন, পরবর্তীতে কিছু হলে আমরা কিন্তু দায়ী থাকব না।’

ঘটনাটি এতটাই ‘আকস্মিক এবং অনভিপ্রেত’ ছিল যে, সেখানে উপস্থিত অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথি, শ্রোতা এবং অনুষ্ঠানের আয়োজকরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যান। এতো অল্প বয়সের এক তরুণ এভাবে মুখের ওপর তাকে হুমকি দিতে পারেন, ডা. জাফরুল্লাহও যেন ভাবতে পারছিলেন না।

তাকে হুমকি দেয়ার কারণে অবশ্য ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ওমর ফারুক কাউসারের বিরুদ্ধে সংগঠনের পক্ষ থেকে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। বরং কাউসারের হুমকির দেয়ার একদিন পরই বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল ও জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বিএনপি নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবস্থানের সমালোচনা করা হয়।

এই ঘটনার জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজকরা ডা. জাফরুল্লাহর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে শোনা যায়নি। এমনকি যে দলটির ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে তিনি পরিচিত, সেই বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনোরকম দুঃখ প্রকাশের খবর এখনো পর্যন্ত আসেনি। তাদের এই নীরবতা অনেক প্রশ্নেরই জন্ম দিয়েছে। এমনটি ছাত্রদল নেতার কাণ্ডটিতে বিএনপির নেতৃত্বের সমর্থন আছে কি-না, সে প্রশ্নও উঠে গেছে

২৬ জুন সভাটির আয়োজন করেছিল এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইআরআই)। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেন, ‘বিএনপির ক্ষমতায় আসার ইচ্ছাই নেই। ক্ষমতায় আসতে হলে ইচ্ছা, আগ্রহ থাকতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে পরিকল্পনা করতে হবে যে, কী কী জায়গায় পরিবর্তন আনবে। সেগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন। আজকে বিএনপি পরিচালিত হচ্ছে আল্লাহর ওহি দিয়ে!’

তবে ওই ছাত্রদল নেতার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তখনো তেমন কোনো শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাননি। পরেও তিনি বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন, ‘ওই ছেলেটা তার নেতা (তারেক রহমান) সর্ম্পকে বক্তব্য দিতে মানা করেছে। তেমন কিছু বলেনি তো। এটাতে আমি কিছু মনে করিনি। সে তার নেতা সম্পর্কে কথা বলতে না করেছে।’

জাফরুল্লাহকে প্রকাশ্যে এভাবে হুমকি দেয়া নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এ ঘটনা নিয়ে ভাসানী অনুসারী পরিষদ এবং দেশের ১০ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

ক্ষমতা এখনো বহু দূর। আর এরই মধ্যে বিএনপি তার বন্ধুদের সমালোচনাই সহ্য করতে পারছে না। তাহলে ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবে বুঝতে হবে? আওয়ামী লীগেকে সরিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনলেই জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। তারা ক্ষমতায় গেলে তো এই ছাত্রদল-যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের অত্যাচারেই জাতি অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ছাত্রদল নেতার হুমকির বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে ভালো ইঙ্গিত বহন করে না। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের আরও বেশি সংযত হওয়া উচিত। তাদের মনে রাখা উচিত এমনিতেই বিএনপির পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলার মতো বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা একবারেই কম। অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ও মাহফুজউল্লাহর মৃত্যুর পর অনেকেই এখন আর কথা বলেন না। এরই মাঝে যতটুকু বলেন তা ওই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আর উনি তো বিএনপির কেউ না। বিএনপির একজন শুভাকাঙ্ক্ষী মাত্র। তার মতো একজন সিনিয়র সিটিজেন ও বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়ার মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে দলের অবস্থান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেয়া হয়ে গেছে। আবার ছাত্রদল নেতার হুমকির পর বিএনপির দুটি অঙ্গসংগঠন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিপক্ষে প্রতিবাদ করায় প্রমাণ হয়েছে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে হুমকি দেয়ার পেছনে দলের সর্বোচ্চ নেতার ইন্ধন রয়েছে। তাই বিএনপির অন্য শীর্ষ নেতারা এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলতে পারছে না।’

বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত এক পেশাজীবী নেতা বলেন, ‘এই ঘটনার জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজকরা ডা. জাফরুল্লাহর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে শোনা যায়নি। এমনকি যে দলটির “থিংক ট্যাংক” হিসেবে তিনি পরিচিত, সেই বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনোরকম দুঃখ প্রকাশের খবর এখনো পর্যন্ত আসেনি। তাদের এই নীরবতা অনেক প্রশ্নেরই জন্ম দিয়েছে। এমনটি ছাত্রদল নেতার কাণ্ডটিতে বিএনপির নেতৃত্বের সমর্থন আছে কি-না, সে প্রশ্নও উঠে গেছে।’

বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের এক শরিক নেতা বলেন, ‘ক্ষমতা এখনো বহু দূর। আর এরই মধ্যে বিএনপি তার বন্ধুদের সমালোচনাই সহ্য করতে পারছে না। তাহলে ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবে বুঝতে হবে? আওয়ামী লীগেকে সরিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনলেই জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না। তারা ক্ষমতায় গেলে তো এই ছাত্রদল-যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের অত্যাচারেই জাতি অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে।’

অবশ্য বিএনপির এক দায়িত্বশীল নেতার দাবি, ‘তারেক রহমানের নির্দেশেই ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে অপদস্ত করা হয়েছে। এটার মাধ্যমে জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে যেমন জবাব দেয়া হলো তেমনি দলের বেসুরো নেতাদেরও বিশেষ বার্তা দেয়া হলো।’

তিনি বলেন, ‘ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনায় মুখর রয়েছেন। তিনি হয়তো বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে মানতে পারছেন না, এ কারণে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। তবে বিএনপির তাকে (হুমকি দাতা ছাত্রদল নেতা) গুরুত্ব দেয়া উচিত হয়নি। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যে যদি বিএনপির এত গাত্রদাহ হয়, তবে বিএনপির যেসব প্লাটফর্মে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বক্তব্য রাখেন সেইসব প্লাটফর্মের দলীয় নেতাদের কঠোর নজরদারিতে রাখা দরকার। বিএনপির প্রার্থীদের তাকে আমন্ত্রণ জানানো বন্ধ করতে হবে।’

আরেক নেতার ভাষ্য, ‘ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী অন্য একটা মহলের হয়ে বিএনপির মধ্যে ফাটল ধরানোর প্রক্রিয়ায় জড়িত রয়েছেন। যে কারণে বিএনপির পক্ষ থেকে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।’

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি-না জানতে চাইলে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক শিকদার বলেন, ‘ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সিনিয়র সিটিজেন, তিনি বিএনপি করেন না। তিনি তার মতো করে বক্তব্য দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের কারণে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়া বা কমার কোনো প্রশ্ন নেই।’

বিএনপির সঙ্গে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে কি-না, সরাসরি এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বলেন, ‘জাফরুল্লাহ চৌধুরী আমাদের দল করেন না। উনি কথা বলেন, উনার যখন যেটা মনে হয় উনি তখন সেটা বলেন। আমাদের আপত্তি থাকলে আমাদের প্রতিবাদ থাকে। আমরা তো জানি উনি যেটা বলেছেন সেটা ওনার ভুল ধারণা। উনার বয়স হয়ে গেছে। অনেক কথাই বলতে পারেন। মানুষের বয়স হয়ে গেলে অনেক কথাই বলেন। যখন তখন অনেক কথাই বলেন, সেভাবেই হয়ত উনি বলেছেন।’

এ প্রসঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি বুঝি না আপনারা কেন একটা ছোট বিষয় নিয়ে এত আলাপ করছেন। বাচ্চা ছেলে করেছেটা কী? আমাকে তো সালামও দিল। এতে সম্পর্ক খারাপের কিছু নেই। আমি তো এটাকে বিষয়ই মনে করছি না একদম। আমি মনে করি আমি তাদের মিত্র। তবে আমার সব কথা তারা পছন্দ করবে তাও আমি আশা করি না। আমি মনে করি, কেউ কেউ অবুঝ হলেও সবাই নয়। আমি তাদের সঠিক পথ দেখানোর যে চেষ্টা চালাই তারা সেটা জানেন, বোঝেনও। তবে থাকে তো কেউ কেউ, যারা খালেদাকে বের করতে পারেনি। তাদের ফ্রাসট্রেশন থেকে তারা অবুঝের মতো কথা বলে। তবে আমি এটাতে কিছু ভাবিনি। আমি ক্ষুব্ধও না। আমি তো রাজনৈতিক কর্মী না। আমি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভালো-মন্দ বলে যাই। আমি খালেদা জিয়াকে খোলা চিঠিও লিখেছি। সেটা দেখে নেবেন।’






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*