Main Menu

কৃষকলীগের এ কেমন আবদার!

Sharing is caring!

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কৃষকলীগের আসন্ন জাতীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী নেতাকর্মীদের কাছ থেকে মাথাপিছু এক হাজার টাকা করে নিয়েছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কৃষকলীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম। কিন্তু টাকা নিয়েও বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ৩৮০টি ফাও টিকিট চেয়ে লিখিতভাবে আবদার করেছেন কৃষকলীগের এ কমিটির নেতারা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন দলের স্থানীয় ও টাকা দেয়া নেতাকর্মীরা।

ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বলছেন, ফাও টিকিট চেয়ে দলকে এভাবে হেও করা ঠিক হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতারাও বলছেন, সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কারণ এর আগে সভা ডেকে সব ইউনিটকে নিজ নিজ উদ্যোগে সম্মেলনে আসার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে ৩৮০টি ফাও টিকিট চেয়ে কৃষকলীগের লিখিতভাবে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে বিব্রত বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও আবেদনের প্রেক্ষিতে লিখিতভাবে কৃষকলীগকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ফ্রি ভ্রমণের সুযোগ না থাকায় আবেদনটি বিবেচনা করারও সুযোগ নেই। এমনই ঘটনা ঘটেছে রেলওয়ের পূর্ব বিভাগ চট্টগ্রামে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষকলীগের জাতীয় সম্মেলন হবে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সেই সম্মেলনে যোগ দিতেই চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসবেন কৃষকলীগের প্রায় ১৯০ জন নেতা-কর্মী। সেজন্যে বাংলাদেশ রেলওয়েকে লিখিতভাবে অনুরোধ করেছেন, তাদের যেন বিনামূল্যে আপ-ডাউন হিসেবে ৩৮০টি টিকিট দেয়া হয়। কৃষকলীগের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটির পক্ষ থেকে এ নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে চিঠিটি দেয়া হয়। যদিও রেলপথমন্ত্রী নুরুল হক সুজন আমার সংবাদকে জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো সুযোগই নেই।

এদিকে আগামী ৬ নভেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কৃষকলীগের জাতীয় সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। এতে চট্টগ্রাম থেকে ১৯০ জন প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষক যোগ দেবেন সম্মেলনে। তারা মূলত ৫ নভেম্বর ঢাকা আসবেন এবং ৬ নভেম্বর সম্মেলন শেষে রাতে চট্টগ্রামে ফিরবেন। তাদের এই যাওয়া-আসার জন্যই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে তূর্ণা-নিশীথা এক্সপ্রেসের চট্টগ্রাম-ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রথম শ্রেণির ফাও টিকিট চায় সংগঠনটি। কৃষকলীগের এমন আবেদনে অনেকটাই বিব্রত বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তবে তারাও কৃষকলীগ নেতাদের লিখিতভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যে তাদের বিনামূল্যে টিকিট সরবরাহের কোনো বিধান নেই। তাই তাদের ফ্রি টিকিট দেয়াও সম্ভব হয়নি।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, কৃষকলীগের আবেদনটি আমরা পেয়েছি। রেলওয়েতে ফ্রি টিকিট দেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। টিকিট পেতে হলে টাকা দিয়েই কিনতে হবে। রেলওয়ে সূত্রমতে, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের প্রথম শ্রেণির প্রতিটি টিকিটের দাম ৭৩৫ টাকা। সেই হিসেবে ৩৮০টি টিকিটের দাম ২ লাখ ৭৯ হাজার তিনশ টাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০ অক্টোবর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তাকে (সিসিএম) উদ্দেশ্য করে চিঠি দেয় বাংলাদেশ কৃষকলীগ চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি। সংগঠনটির প্যাডে সভাপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠিতে এই ফ্রি টিকিটের আবেদন জানানো হয়।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দলীয় একটি সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দলের কোনো সহযোগী সংগঠন এভাবে কি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনামূল্যে চাইতে পারে? এ ব্যাপারে কৃষকলীগের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটির সভাপতি নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, তারা দরিদ্র কৃষক হিসেবে এই ফ্রি টিকিটের আবেদন করেছিলেন।

তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন, আমরা গরিব কৃষক। বেশিরভাগের আর্থিক অবস্থা ভালো না। ট্রেনের টিকিট কেনার টাকা নাই। যে কারণে লিখিতভাবে জানিয়েছেন— ফ্রি টিকিট দেয়ার কোনো সিস্টেম আছে কিনা। তিনি আরও বলেন, আমরা চেয়েছি আমাদের ১৯০ জনের যাওয়া-আসার জন্য যেন একটা বগি দেয়া হয়।

কিন্তু প্রতিনিধি তালিকায় থাকা অনেকেই ট্রেনের টিকিট ফ্রি চাওয়ার বিষয়টিতে ক্ষোভ প্রকাশ ছাড়াও দাবি করে বলছেন, তারা প্রত্যেকে ট্রেনের টিকিটের জন্য এক হাজার টাকা করে দিয়েছেন। তারপরও সংগঠনকে এভাবে হেয় করার ঘটনায় তারা ক্ষুব্ধ। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে নজরুল ইসলাম বলছেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যখন জানিয়ে দেয় যে, তারা ফ্রি টিকিট দিতে পারবে না, তখনই তারা সংগঠনের প্রতিনিধিদের থেকে এই চাঁদা সংগ্রহ করেন। সম্মেলনে যাওয়া-আসার ভাড়া এবং খাওয়া বাবদ এই অর্থ নেয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, যখন রেলওয়ে থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে ফ্রি টিকিট দেয়ার সিস্টেম নাই, তখন আমরা সবাইকে বললাম যারা যারা যেতে ইচ্ছুক তারা যেন চাঁদা দেয়। যেতে-আসতে খাওয়া দাওয়া করার তো খরচ আছে। আগে আমরা ১৯০ জনের ফ্রি টিকিটের আবেদন করেছিলাম। সেটি নাকচ হওয়ার পর এখন ১৪০ জনের জন্য আবার দরখাস্ত করেছি টাকা দিয়ে টিকিট কেনার জন্য।

তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে বলছে, একসঙ্গে এভাবে ১৪০ জন যাত্রীর জন্য টিকিট বিক্রি করা যাবে কি না, সেটা তাদের দেখতে হবে।

কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সামসুল হক রেজা বলেন, এভাবে টিকিট চাওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কারণ আমরা সমাবেশে আসার জন্য সবাইকে নিজ নিজ উদ্যোগে আসার নির্দেশনা ইতোমধ্যেই দিয়েছি। এছাড়া এ আবদার সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। ঘটনা সত্য হয়ে থাকলে আমরা অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

এদিকে কারা বিনামূল্যে টিকিট পাবেন বা কাদের জন্য বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা থাকবে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত নিয়ম-নীতি রয়েছে। বাংলাদেশের কয়েকটি সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে রেলওয়ের প্রথম শ্রেণিতে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের দেয়া কার্ড দিয়ে ট্রেনের সর্বোচ্চ শ্রেণিতে ভ্রমণ করতে পারবেন বিনামূল্যে। এর জন্য তাদের কার্ডের নাম্বার স্টেশনের কম্পিউটারাইজড টিকিট কাউন্টারে দিলে টিকিট বের হবে এবং এতে কোনো টাকাই দরকার হবে না।

কিন্তু সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদেরও ফ্রি ভ্রমণের সুযোগ নেই। তাদের জন্য কেবল অগ্রাধিকারভিত্তিতে টিকিট দেয়ার সুবিধা আছে। যদিও সেই টিকিটের পুরো দাম পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া প্রতিটি ট্রেনে চারটি আসন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। ট্রেনগুলোয় প্রতিবন্ধীদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে ২০টি টিকিট অর্ধেক মূল্যে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। কোটার মাধ্যমে এ টিকিট দেয়া হয়। সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা ওয়ারেন্টের মাধ্যমে ফ্রিতে টিকিট সংগ্রহ করতে পারেন। ওই টিকিটের টাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পরে রেলওয়েকে পরিশোধ করা হয়। এছাড়া দাম পরিশোধ করলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বগির ব্যবস্থা করতে পারে।

রেলওয়ে যেখানে জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেখানে লিখিতভাবে এ ফ্রি টিকিট চাওয়ার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলেই মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

আমার সংবাদকে তিনি বলেন, এ ধরনের আবেদনকে কোনো অবস্থায় যৌক্তিক বলে বিবেচনা করা যাবে না। এটা বেআইনি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। তারা তাদের মূল সংগঠনের ক্ষমতা ব্যবহার করেই এ ধরনের আবেদন জানিয়েছেন। সংগঠন ইতোমধ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় কৃষকলীগের এ ধরনের প্রচেষ্টাকে ‘রং সিগনাল’ হিসেবে দেখছেন তিনি।

রেলপথমন্ত্রী নুরুল হক সুজন আমার সংবাদকে বলেন, ফ্রি টিকিটের কোনো সুযোগ নেই। হ্যাঁ দিতে পারি, কিন্তু এই টাকাটা আমাকেই দিতে হবে। এছাড়া আর কোনো সুযোগ নেই। এমন টিকিট দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, লিখিতভাবে আবেদন করলেও টিকিট দেয়ার সেই ক্ষমতা আমার নেই, এভাবে টিকিট দেয়ার ক্ষমতা কি একজন মন্ত্রীর আছে?

সম্মেলনে আসতে চায় জানালে তিনি বলেন, হ্যাঁ সেক্ষেত্রে লোকজন বেশি হলে কেউ যদি আমাদের কাছে ডিমান্ড দেয় তাহলে আমরা বাড়তি বগির ব্যবস্থা করে দিতে পারি। সম্মেলনে আসুক আর যেখানেই আসুক তাদের টিকিট কেটেই আসতে হবে। যেমনটা হয়- সাধারণত ঈদের সময়। যাত্রীদের বাড়তি চাপ কমাতে যেমন বাড়তি বগি কিংবা অন্যান্য ব্যবস্থা করা হয় তেমনি সম্মেলনে আসতে হলে বাড়তি মানুষের চাপ কমাতে বগির ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া আর কোনো সুযোগ নেই।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*