Main Menu

কুয়েতের প্রবাস জীবন : ৭ লাখের ভিসা খরচে বেতন মিলে ২২ হাজার

Sharing is caring!

গত শুক্রবার কুয়েতের ফরওয়ানিয়া এলাকায় যাব বলে বের হলাম। কিন্তু ফরওয়ানিয়া যাওয়ার গাড়ি না পাওয়ায় সেফদিতে নেমে পড়লাম। গাড়ি থেকে নেমে চোখে পড়ল হলুদ রঙের পোশাক গায়ে দেওয়া কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন। এঁদের বেশির ভাগ ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। আমিও গাড়ির জন্য অপেক্ষা করলাম। অনেকক্ষণ গাড়ি না পাওয়ায় কৌতূহলবশত তাঁদের একজনের সঙ্গে আলাপ করলাম। ‘ভাই, সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন কি গাড়ির জন্য?’ ফুলবাবু (ছদ্মনাম) নামে ২৫ বছরের ছেলেটি আমাকে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ ভাই, আমাদের কোম্পানির গাড়ি আসবে।’

আমাকেও জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনিও কি গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন?’ বললাম, ‘জি ভাই, ফরওয়ানিয়া যাব, কিন্তু গাড়ি পাচ্ছি না।’ ছেলেটি বললেন, ‘আপনি চাইলে আমাদের সঙ্গে যেতে পারেন, আমরাও ফরওয়ানিয়ার পাশে খায়তান যাব। যাক, তাহলে তো ভালোই।’

ছেলেটির কথা শুনে স্মার্ট শিক্ষিত মনে হলো। এমন সময় তাঁদের গাড়ি এসে দাঁড়াল। সবাই তাড়াহুড়ো করে উঠছেন। ডিউটি শেষ, সবাই বাসায় যাবেন। আমাকেও ডেকে নিয়ে গাড়িতে উঠালেন এবং নিজের পাশের সিটে বসতে দিলেন।

গায়ে সবার পোশাক দেখে বুঝে ফেললাম তাঁরা ক্লিনারের কাজ করেন। যেহেতু সুযোগ পেয়েছি, মনে হলো তাঁদের গল্পটাও শোনা দরকার। জিজ্ঞাস করলাম, ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ ছেলেটি উত্তর দিলেন ‘নোয়াখালী।’ বললাম, ‘আপনাকে দেখে তো শিক্ষিত মনে হচ্ছে। আপনি ক্লিনার ভিসায় আসলেন যে?’ ছেলেটি বললেন, ‘কেউ কি আর জেনেশুনে ক্লিনার ভিসায় আসে? আমি এসেছি মেডিকেল ভিসায়। কিন্তু এখন রাস্তার ময়লা পরিষ্কার করছি।’

মধ্যপ্রাচ্যে যাঁরা আছেন, তাঁরা জানেন দালালের কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল থাকে না। একটার কথা বললে কাজ দেয় আরেকটা। কিন্তু তাই বলে শিক্ষিত স্মার্ট একটা ছেলেকে এভাবে রাস্তা পরিষ্কার করার কাজে লাগিয়ে দেবে!

শীতকালে না হয় সহ্য করে থাকা যায়, কিন্তু গরমকালে ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় কাজ করবেন কীভাবে!
বললাম, ‘আসতে খরচ কত পড়ল?’ উত্তর দিলেন, ‘সব মিলিয়ে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।’ ‘ক্লিনার ভিসাতে তো বেতন কম। শুনেছি ৬০-৮০ (বাংলা ১৬-২২ হাজার টাকা) দিনার।’ ছেলেটি বললেন, ‘হ্যাঁ ভাই, বেতন ৮০ দিনার তথা বাংলা ২২ হাজার টাকা। থাকা কোম্পানির হলেও খাওয়া নিজের।’
‘এত টাকা দিয়ে এসে ২২ হাজার টাকার চাকরি করে চলেন কীভাবে?’ হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ‘কী করব ভাই? কপালে যা থাকে তা–ই হবে। ৮ ঘণ্টা কোম্পানির ডিউটি শেষ করে বিকেলে একটা পার্টটাইম কাজ করি। এভাবে কোনোমতে নিজেকে চালিয়ে নিচ্ছি।’ হাসিমুখে কথা বললেও বুঝতে বাকি নেই বুকভরা কষ্ট নিয়ে কথাগুলো বলছেন।

জিজ্ঞাস করলাম, ‘কখন আসছেন?’ বললেন, ‘করোনার আগে আসছি। এরপর করোনার কারণে ২ মাস কাজ বন্ধ ছিল। বাড়িতে অনেক ধারদেনা করে আসছি। এগুলো টানছি এখন। প্রবাসে এসেছিলাম ভালো একটা সময় কাটানোর জন্য। ভালো বেতনে চাকরি করব, কিন্তু সেটা দুঃস্বপ্নই থেকে গেল। ভালো দিন বলতে কিছু নেই এখন। অভাবের সংসার। দেশে পরিবারকে খাওয়াতে হয়। কবে তাদের টাকা পাঠাব, সব সময় সেই টেনশনে থাকি। তাদের কাছে টাকা পাঠিয় ধারদেনা দিতে দিতে নিজের কাছে আর কিছুই থাকে না।’

ফুলবাবুর সঙ্গে ক্লিনারের কাজ করেন চাঁদপুরের রমিজ। অনেক বছর আগে তিনিও কুয়েত আসেন। ক্লিনার ভিসায় আসার পর আর ভিসা পরিবর্তন করতে পারেননি। শুনলাম তাঁর গল্পও। তিনিও দালালের মাধ্যমে কুয়েত এসেছেন। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে কোম্পানির পোশাক পরে কাজে নেমে যেতে হয়। সারা দিন উত্তপ্ত গরমে কখনো আবার হাড়কাঁপানো শীতে রাস্তা পরিষ্কার করতে হয়।

ডিউটি শেষে বাসায় গিয়ে আবার রান্না করতে হয়। এভাবে চলছে জীবন। কথা বলার এমন সময় হঠাৎ মাঝপথে গাড়ি থামিয়ে দিলেন চালক। সবাই গাড়ি থেকে নেমে যাচ্ছেন। কারণ কী? এখনো তো গন্তব্যে আসিনি। আমিও নেমে পড়লাম। নেমে দেখলাম, দুই লেনের মাঝখানে হলুদ রঙের অনেকগুলো পুঁটলি বাধা। যেটা তাঁদের পোশাকের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।

পরে বুঝলাম, এগুলো রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নেওয়া ময়লা। সব একজায়গায় জমাট বেঁধে রাখছে। এগুলো আবার সবাই ময়লার গাড়িতে তোলে দিচ্ছেন। অনেকের পার্টটাইম কাজ আছে, তাই তাড়াহুড়ো করছেন বাসায় যাওয়ার জন্য। কিন্তু কোম্পানির ফোরম্যান কাউকে ছাড়ছেন না। মন চাচ্ছিল তাঁদের সবার গল্পগুলো শোনার। একেকটা গল্পের সঙ্গে কতগুলো স্বপ্ন জড়িয়ে থাকে। সময়ের অভাবে আর কথা বলা হলো না।

এভাবে চলছে প্রবাসজীবন। দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন অধিকাংশ প্রবাসী। ৭–৮ লাখ টাকায় এসে ২০–২২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে। কেউবা দেশে চলে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে স্ট্রোক করে অনেকে চলে যাচ্ছেন না–ফেরার দেশে।

অনেকে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছেন প্রবাসে। পরিবার-পরিজনকে একটিবার দেখার সুযোগও হয় না তাঁদের।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*