Main Menu

করোনার টিকা নিয়ে হঠকারিতা নয়

Sharing is caring!

মানুষের মরণভয় জয় করতে শুরু হয়েছে বহুলপ্রত্যাশিত টিকাদানের কাজ। কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষা দিতে ইউরোপ-আমেরিকায় সিনিয়র সিটিজেন এবং ফ্রন্টলাইনে কর্মরত সেবাদানকারীদের মাঝে টিকাদান কর্মসূচি চলছে। আমরাও হয়তো অচিরেই নেমে পড়ব এ কাজে। আমরা সবাই চাই মানব শরীরে এখনও এ টিকার শতভাগ কার্যকারিতা ইতিবাচক প্রমাণিত হোক। কারণ, টিকা প্রদান শুরু করা প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যে ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা প্রদান শুরুর একদিন পর সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিবিসি বলেছে, মারাত্মক অ্যালার্জিজনিত সমস্যা রয়েছে এমন মানুষের এ টিকা নেয়া উচিত নয়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের দু’জন কর্মী ভ্যাকসিন গ্রহণের একদিন পর তাদের শরীরে অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ার পর এ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট ও ভারত বায়োটেকের উদ্ভাবিত ভ্যাকসিন জরুরিভিত্তিতে ব্যবহারের অনুমোদন পায়নি। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের প্রধান বলরাম ভার্গভ জানিয়েছেন, ‘ভ্যাকসিনের উপকার ও ঝুঁকির অনুপাতে সন্তুষ্ট হলে তবেই কোনো সংস্থাকে প্রতিষেধক বাজারে ছাড়ার ছাড়পত্র দেয়া হয়।’ তবে শেষ পর্যন্ত সব কোম্পানির ক্ষেত্রে সেটি হোক বা না হোক, জীবনরক্ষাকারী টিকার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে বহু শতাব্দী আগে থেকে। করোনার কঠিন কামড়ে পর্যুদস্ত মানুষ এ দিনটির জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষার প্রহর গুনে চলেছে।

একটি কার্যকর টিকাদান শুরু হওয়ার খবরে সাধারণ মানুষ যেমন খুশি, তেমন খুশি হ্যাকাররা। তারা টিকার সরবরাহ চেইনে হামলে পড়ছে বলে খবরে জানা যাচ্ছে। তারা ভাবছে এটি অবৈধ আয়ের স্বর্ণালি সুযোগ। তারা টিকার উৎপাদন, সংরক্ষণাগার, শিপমেন্ট, সরবরাহ পথ, বণ্টন- সব জায়গায় ফাঁদ পেতে বসেছে!

মধ্যপ্রাচ্যসহ গরমের দেশগুলোতে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা সংরক্ষণ করা নিয়ে দুশ্চিন্তার মাঝে সেসব দেশে টিকা সরবরাহ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম সংকট। ব্রিটেনের পর বাহরাইন ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার অর্ডার পেতে আগ্রহী। কিন্তু সাইবার নিরাপত্তায় কোল্ডস্টোরেজ কোম্পানিগুলোর কোনো বিনিয়োগ নেই। তাই থার্ড পার্টির আক্রমণের আশঙ্কা করছে তারা।

সারা পৃথিবীতে করোনার প্রকোপ এখনও উদ্বেগজনক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯ ডিসেম্বর ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩ হাজার ৭১ জন। গত এপ্রিলের পর একদিনে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। গত মাসে ‘থ্যাংকস গিভিং ডে’ উপলক্ষে কর্তৃপক্ষের ঘরে থাকার সতর্কতা উপেক্ষা করে লাখ লাখ মানুষ ভ্রমণে বের হয়েছিল। তখন থেকেই সংক্রমণ ও মৃত্যু সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা ছিল। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলে সংবাদে এসেছে।

আমাদের দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার আজ কমছে, কাল বেড়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা হলে প্রভাতের সঙ্গে মোলাকাত হবেই। কিন্তু আবার প্রভাত হলে আবার সন্ধ্যা নামতে পারে- এটাই স্বাভাবিক, এটাই সত্য। তাই এটি ভুলে যাওয়া বোকামি। কেউ কেউ বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের যুগে মানুষের জন্য বড় খুশির বিষয় হল যন্ত্রই সবকিছু করে দিতে পারবে। কিন্তু করোনার প্রকোপ কমাতে এ পর্যন্ত কী করতে পেরেছে বা করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? জন্ম ও মৃত্যুর ওপর খবরদারি করার মতো মানুষের দম্ভ এখনও শুধু অহমিকার মতো মনে হচ্ছে। টিকার ফর্মুলা তৈরির গবেষণা করার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত কাজে লাগানোর মতো কোনো সুফল দিতে পেরেছে বলে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। যন্ত্রের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে। মানুষের মগজই আসল। বাকিটা মেকি!

একটি গাছের অনেক শেকড় থাকে। কিন্তু মূল শেকড়টাই আসল ভার বহন করে। এর অর্থ হল- প্রকৃত মূলটাই মূল। মূল ছাড়া শাখা-প্রশাখারা ঠিকানাবিহীন। মানুষ নিজেদের স্বার্থে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরও অহেতুক নানা শাখা-প্রশাখা তৈরি করে ফেলে। এভাবে ভুল পথে চলে যায়। ভুল যুক্তি দেয়। অন্ধকারের দিকে ধাবিত করে বিভ্রান্ত করে তোলে। ইবলিস বা প্রধান শয়তান মানুষকে ভুল যুক্তি দেয়ার নির্দেশনা দান করে। এজন্য সে ছলনার আশ্রয় নেয় এবং কৌশলে মায়াকান্না করতে ভুল করে না। ইবলিসের কৌশল অনেক ক্ষেত্রে কাজে লাগে। কারণ, তার নীতি অনুসরণ করার শিষ্য অগণিত।

হজরত আদমকে (আ.) বেহেশত থেকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনাটি ছিল মানুষের ওপর মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের দেয়া প্রথম শাস্তি। ইবলিসের তৎপরতায় মানুষ প্রথম মহান আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে গন্ধম ফল ভক্ষণ করে বেহেশত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল। ইবলিস আজও মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়। সে সেটা দিতে পারে, কারণ সেটা দেয়ার ক্ষমতা তথা মানুষের চিন্তা-চেতনায় দ্রুতগতিতে চলাচল করার ক্ষমতা সে মহান আল্লাহর কাছে থেকে আদায় করে নিয়েছিল। এজন্য ইবলিসের অনুসারীরাও বেশ শক্তিধর। তারা অন্যায়কে ন্যায় বলে চালিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দ্বিধা করে না।

এভাবে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব থেকে যুগে যুগে সভ্যতার সংকট শুরু হওয়ার ইতিহাস রয়েছে এবং সেসব সংকট নিরসনে মহামানবদের পৃথিবীতে আগমনের উদাহরণ রয়েছে। এমনই এক সংকট থেকে মুক্তিদানের উদ্দেশ্যে আরবের অন্ধকার সমাজে আলোর দূত হিসেবে এসেছিলেন মানবতার মুক্তিদূত হজরত মোহাম্মদ (সা.)। তাঁর ওপর নাজিলকৃত মহাগ্রন্থ আল কোরআন থেকে শিক্ষা নিয়ে পৃথিবীতে নিত্যনতুন গবেষণা চালাচ্ছে মানুষ। যারা অন্যায়ের প্রণোদনা দেয়, হক কেড়ে নেয় এবং মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে, তাদের জন্য পরবর্তী জীবনের কথা নাই বললাম, এ পৃথিবীতেই শাস্তি পাওয়ার ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। তাদের নাম চিরদিন ঘৃণাভরে উচ্চারিত হতে থাকবে। কারণ, তাদের অপরিণামদর্শী, অন্যায় কাজের রেশ ধরে সূচিত হয় বিশৃঙ্খলা, মারামারি, যুদ্ধ ও চরম অশান্তি। এবং এ থেকে শুরু হয় দুর্নীতি, মহামারী, অভাব ও দুর্ভিক্ষ। সবাই জানেন এগুলো ইতিহাসের শিক্ষা। এভাবে বহু দাম্ভিকতার অন্যায় কাজের ফলস্বরূপ চাকচিক্যময় সভ্যতার আভরণ মিইয়ে গেছে ক্ষণিকেই। মহাকালের সাক্ষী হিসেবে বইগুলো সেসব ঘটনার বিবরণ দিচ্ছে। কিছু জ্ঞানী মানুষ সেসব বইপুস্তক অধ্যয়ন করে সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আহরণ করলেও ইবলিসের প্ররোচনায় সত্যকে অস্বীকার করে কালাতিপাত করে কালেরগর্ভে হারিয়ে যান এবং তাদের নিন্দিত কৃতকর্মের ফলে ঘৃণিত হতে থাকেন।

করোনার সময় টিকার ইতিবাচক খবরে ইবলিসের বংশধররা মায়াকান্না করে একদিকে মোহনীয় বক্তব্য দিচ্ছে, অন্যদিকে খুশি হয়ে সেখান থেকে অবৈধ আয়ের যে স্বর্ণালি সুযোগ তৈরি করার জন্য মরিয়া হয়ে হ্যাকিংয়ে নেমে পড়েছে, তা মানবতার জন্য নতুন বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ভেজাল টিকার ব্যবসা পৃথিবী থেকে মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার নামান্তর। তাদের অনুসারীরা যে কোনো উপায়ে অর্থ-সম্পদ আয় করে। চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি করে ইবলিসের মোহনীয় আহ্বানে সত্যকে অস্বীকার করতে কুণ্ঠিত হয় না। এমনকি মানবতার মহাবিপর্যয়ের সময়েও তাদের চেতনা জাগে না।

আমরা নিজেদের ভালো-মন্দ নিজেরা উপলব্ধি করতে না পেরে শয়তানের মায়াকান্নায় ভুলে এবং তার ক্রমাগত ধোঁকায় নিজেকে শামিল করে অন্যায়কে ন্যায় বলে চালাতে ব্যস্ত হয়ে যাই। স্বকীয়তা ভুলে গিয়ে সীমা লঙ্ঘনকারী ইবলিসদের ধ্বজাকে অনুসরণ করে পঙ্কিলতায় মিশে যেতে উদ্যত হই। ফলে আত্মার পঙ্কিলতা দূরীভূত হয় না, দেহ-মনে পবিত্রতার ভাব জাগে না। তাই করোনার মতো জীবন সংহারী অতিমহামারীর দুঃসময়ে বৈশ্বিক ইবলিসরা ধোঁকাবাজির মাধ্যমে অবৈধ আয়ের স্বর্ণালি সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। মানুষ পরস্পরের দুঃখকষ্টে সহায়তা না করে ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে, মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছে। টিকাপ্রাপ্তি, এর সংরক্ষণ, সরবরাহ, বণ্টন ও প্রদানের কাজে সহায়তা না করে হঠকারী আচরণ করে নিজেদের বিপর্যয় ত্বরান্বিত করে চলেছে। এজন্য এ দুঃসময়ে যে সার্বিক ক্ষতি হচ্ছে, সে ক্ষতি সবার। এ ক্ষয়ক্ষতি রোধে বোধোদয় হোক সবার, সংবিৎ ফিরুক অচিরেই।

ড. মো. ফখরুল ইসলাম : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান

fakrul@ru.ac.bd






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*