Main Menu

একে একে নিভিছে দেউটি

‘রফিকুল ইসলাম’ নামটির সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮৮ সালের দিকে। প্যারিস থেকে ইন্ডোলজিতে স্নাতকোত্তরের পাঠ শেষ করে প্রথমবার দেশে ফিরেছি। ভাষাবিজ্ঞানে কিঞ্চিৎ আগ্রহ বোধ করছিলাম এবং বাংলা ভাষায় লেখা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত স্যারের ‘ভাষাতত্ত্ব’ বইটা পড়ে ফেললাম। এদিক থেকে দেখলে পরিচয় না থাকা সত্ত্বেও রফিক স্যারই আমার ভাষাবিজ্ঞানের প্রথম গুরু। অনেকটা মহাভারতের দ্রোণাচার্য একলব্যের কাহিনীর মতো।

বছর দশেক পর ১৯৯৮ সালের দিকে স্যারের সঙ্গে পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে। আমি তখন ভাষাবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে প্যারিস থেকে দ্বিতীয়বার দেশে ফিরেছি এবং বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে টুকটাক লেখালেখি শুরু করেছি। শ্রী পবিত্র সরকার সে সময় কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ডাকযোগে আমার সদ্য প্রকাশিত ‘সঞ্জননী ব্যাকরণ’ বইটা তাকে পাঠিয়ে কোনো প্রাপ্তিস্বীকার পত্র পাচ্ছিলাম না। রফিক স্যার আমাকে জানিয়েছিলেন, পবিত্র সরকার বইটি পেয়ে খুশি হয়েছেন ও প্রশংসা করেছেন।

রফিক স্যার সেদিন বলেছিলেন, ‘সারাজীবন ধরে ভাষাবিজ্ঞানের অনেক বই কিনেছি, কিনেছি ফরাসি ভাষাবিজ্ঞানী অন্তোয়ান মেইয়ের বই, কিন্তু পড়া হয়নি। শিশিরকে দিয়ে দেবো, ও পড়বে!’ আমার সাম্প্রতিক লেখাগুলো স্যারের চোখ এড়ায়নি দেখে পুলকিত হলাম। আমার প্রতি স্যারের এমন পক্ষপাতে উপস্থিত বাকি শিক্ষকেরা একটু অবাক হওয়াতে তিনি বললেন, ‘ওই বইগুলোর মর্ম তোমরা বুঝবে না। ওতো লিঙ্গুইস্ট!’ স্যারের এই কথায় স্বতঃষ্ফূর্ত সরলতা যতটা ছিল, সত্য হয়তো ততটা ছিল না। যদিও কথাটা আমার জন্য একটি জবরদস্ত সার্টিফিকেট বটে।

স্যারের সঙ্গে দ্বিতীয়বার দেখা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে। চট্টগ্রামি বাংলার ধ্বনিতত্ত্বের ওপর আমার বক্তৃতা ছিল। স্যার ছিলেন অন্যতম আলোচক। আলোচনার আগে মহাপরিচালকের কক্ষে আমরা কয়েকজন গল্প করছিলাম। স্যার পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকে পাঞ্জাব ও সিন্ধু, হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো ভ্রমণের কথা বললেন। পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি বুদ্ধিজীবীরা নাকি তাদের মাতৃভাষা পাঞ্জাবিতে লিখতে কিংবা কথা বলতে আগ্রহী নয়, বরং উর্দু কিংবা ইংরেজি তাদের অধিকতর পছন্দের ভাষা। স্যার বললেন, ‘এ কারণেই মাতৃভাষার প্রতি আমদের বাঙালিদের আবেগটা ওরা ঠিক বুঝতে পারতো না।’

মদ্যপানের প্রতি পাঞ্জাবিদের অতি আসক্তির কথাও বলেছিলেন স্যার। পাঞ্জাবি মায়েরা সন্ধ্যা হলেই নাকি যুবতী মেয়েদের ঘরে তালা দিয়ে রাখতে বাধ্য হন, বাপের কাছ থেকে তাদের নিরাপদ রাখতে। আমি বলেছিলাম, ব্যাপারটা নতুন নয়। মহাভারতের কর্ণ পর্বে সারথি শল্যকে কর্ণ বলেছিল, তোমাদের দেশের মেয়েরাতো মদ খেয়ে মাতাল হয়ে শ্রোতার নিতম্বে মৃদু চাটি দিয়ে বলে, প্রয়োজন হলে আমার স্বামীটিকে নিয়ে যাও, মদের পাত্র নিতে চাইলে কিন্তু দেবো না!

যতদূর মনে পড়ে, স্যারের সেদিনকার আলোচনায় উঠে এসেছিল স্টার কাবাব রেস্টুরেন্টের ইতিহাস। এর মালিক কমলাপুর রেলস্টেশনে পিঁয়াজু-সিঙারা বিক্রি করতেন। স্যারের বাবা ছিলেন স্টেশনের বড় কর্মকর্তা এবং তিনিই স্টার কাবাবের তরুণ মালিককে এই দোকান খোলার সুযোগ দিয়েছিলেন। ঠাটারি বাজারের বিখ্যাত স্টার কাবাব এবং গত ৫০ বছরে স্টার কাবাবের এত রমরমার মূলে নাকি কমলাপুর স্টেশনের ওই ছোট্ট দোকানটি। পরবর্তীতে স্টার কাবাবের নতুন কোনো শাখা খোলা হলে কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ স্যারের বাবাকে এবং তিনি গত হওয়ার পর স্যারকে স্টার কাবাবের মালিকপক্ষ নাকি দাওয়াত দিতে ভুলতো না।

আহমেদ শরীফের সর্বশেষ পুস্তক ‘ভাব বুদবুদ’ লেখকের ইচ্ছা মোতাবেক তার মৃত্যুর ২০ বছর পরে ছাপা হয়েছে। স্যারকে বললাম, ‘আহমেদ শরীফতো ৭১ সালে আপনার ভূমিকার সমালোচনা করেছেন তার বইয়ে!’ স্যার রেগে গিয়ে বললেন, ‘তাতো করবেনই। উনি নিজে ৭১-এ কী করেছেন সেটা লিখেননি?’ স্যার হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন। কীভাবে এক রাজাকারের কারণে ৭১ সালে আহমেদ শরীফের জীবন বেঁচেছিল এবং স্বাধীনতার পর মারমুখী মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে সেই রাজাকারের জীবন বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছুটে গিয়েছিলেন আহমেদ শরীফ, সেই গল্প বললেন আমাদের। এই রাজাকারটি পরে বিখ্যাত একটি পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিল এবং এই পত্রিকাটি কমপক্ষে ২ দশক বঙ্গবন্ধু-উত্তর বাংলাদেশে মৌলবাদ প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল।

স্যার দ্বিতীয়বার আমার ওপর রেগে যান সম্ভবত ২০১২ সালে আহমাদ মাজহার সম্পাদিত ‘বইয়ের জগৎ’ পত্রিকায় আমার অতি কড়াপাকের একটি রিভিউ পড়েন। বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ তখন সদ্য প্রকাশিত হয়েছে, রফিকুল ইসলাম এবং পবিত্র সরকার যার অন্যতম সম্পাদক। আমি লিখেছিলাম, বাংলা একাডেমির এই ব্যাকরণ প্রকল্পে অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হয়েছে। ইতোপূর্বে বাংলা ভাষা নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, এই ব্যাকরণে না আছে তার কোনো স্বাক্ষর, না আছে লেখকদের নিজস্ব গবেষণার কোনো প্রমাণ। ‘ব্যাকরণ’ বলতে কী বোঝায় সেটাই যেন সুযোগ্য সম্পাদকরা কোনো কারণে বিস্মৃত হয়েছেন। বাংলা একাডেমির এই ব্যাকরণ, এখনও আমি মনে করি, বাংলাদেশের জনগণের করের টাকার এক বিপুল অপচয় এবং বাঙালি জাতির সঙ্গে সম্পাদকদ্বয় এবং লেখকবৃন্দের এক করুণ মশকরা।

এই ব্যাকরণ প্রকল্প শুরু হওয়ার বছর দুয়েক আগে, ২০০৯ সালে ‘বাংলা ব্যাকরণের রূপরেখা’ শীর্ষক একটি পাণ্ডলিপি জমা দিয়েছিলাম বাংলা একাডেমিতে। তদবির করতে প্রায়ই একাডেমিতে গিয়ে খামাখা জুতার তলা ক্ষয় করছি দেখে এক বন্ধুস্থানীয় পরিচালক দয়াপরবশ হয়ে আমাকে জানিয়েছিলেন, একাডেমির ‘মহাব্যাকরণ’ প্রকাশিত হওয়ার আগে অন্য কোনো ব্যাকরণ মহাপরিচালক একাডেমি থেকে প্রকাশ করতে দেবেন না। আমার সঙ্গে বিস্তর বাদানুবাদ এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভাষাবিজ্ঞানীদের বহু সুপারিশের পর মতিউর রহমান ২০১৬ সালে অবশেষে এই বইটি প্রকাশ করেন প্রথমা থেকে। এ পর্যন্ত বইটির একাধিক সংস্করণ হওয়াতে কোনোমতে প্রকাশকের কাছে আমার নিজের মুখরক্ষা হয়েছে।

ব্যাকরণের সম্পাদকীয় এবং স্যারের প্রবন্ধেরও তীব্র সমালোচনা ছিল আমার রিভিউতে। ব্যাপারটা কেউ সম্ভবত স্যারের কানে তুলেছিল এবং তিনি লোক পাঠিয়ে কনকর্ড টাওয়ারে রাখাল রাহার অফিস থেকে পত্রিকাটি সংগ্রহ করেছিলেন। আমাকে স্যার কখনও কিছু বলেননি, তবে বহুদিন তার রাগ ছিল আমার উপর। দিনের পর দিন চোখের সামনে আমাকে দেখেও তিনি উপেক্ষা করতেন, সালাম দিলেও নিতেন না। রেগেছিলেন বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানও। অনেকটা জোর করে আমি তাকে সালাম দিতাম, করমর্দন করতাম। ২০১৯ সালে শান্তিনিকেতনের বাংলাদেশ ভবনে বঙ্গীয় কর্তৃক আয়োজিত এক সম্মেলনে অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে আমি অবশেষে খানের মানভঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

কোনো এক ২১শে ফেব্রুয়ারির টকশোতে আমি রফিক স্যারের সহবক্তা হয়েছিলাম। শোয়ের আগে এক ঘরে বসেছিলাম আমরা। কিন্তু বরাবরের মতোই আমার সঙ্গে তিনি কোনো কথা বলছিলেন না। আলোচনার সময় আমি যখন স্যারের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করলাম, স্যারের চমৎকার বাংলা ও ইংরেজির প্রশংসা করলাম, তখন তার অসন্তুষ্টির বরফ গলতে শুরু করেছিল। সেই টকশোতে স্যারের একটি বক্তব্য এখনও মনে আছে, ‘একটি বাড়ির নাম “দোলন চাঁপা” বাংলায় না লিখে লেখা হয়েছে ইংরেজিতে এবং এমন ভুল বানানে, যার বাংলা উচ্চারণ হবে “দোলন ছাঁফা”।’ শেষবার স্যারের সঙ্গে দেখা হয় ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে, এ বছরের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে। সেখানেও আমি বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণে স্যারের অবদান বার বার শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করেছি।

মানুষ মাত্রেরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রফিকুল ইসলাম কিংবা শামসুজ্জামান খানও মানুষই ছিলেন। স্মৃতিচারণে ব্যাকরণের প্রসঙ্গটা তুললাম। মনের ভাসানচরে থিতু হওয়া কোনো তিক্ততার কারণে নয়, এই সব ঘটনাকে বাংলাদেশের বুদ্ধিজৈবনিক ইতিহাস রচনার অপরিহার্য তথ্য বিবেচনা করি বলে। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আজীবন বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির দেখভাল করেছেন এবং এ জন্য জাতি তাকে কম-বেশি সম্মানও দিয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তার অন্যতম দুটি গবেষণার বিষয়। গবেষণা যাই করে থাকুন না কেন, একজন রফিকুল ইসলাম কিংবা আনিসুজ্জামানের জীবনটাই পরবর্তী প্রজন্মের গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে। এতটাই দীর্ঘ ও বর্ণিল ছিল তাদের একেক জনের জীবন। রফিকুল ইসলাম ছিলেন বাংলাদেশের চলমান বিশ্বকোষ, জীবন্ত ইতিহাস। ‘একে একে নিভিছে দেউটি!’ যত অপূর্ণতাই তাদের থাকুক না কেন, আমাদের সম্ভাব্য সব পূর্ণতা নিয়েও একজন রফিকুল ইসলাম কিংবা আনিসুজ্জামানের শূন্যস্থান পূরণ করে উঠতে পারবো না।

প্রয়াত নাট্যকার সাঈদ আহমেদের মুখে শুনেছিলাম, রফিক স্যারের এক যমজ ভাই ছিলেন। ছোটবেলায় নাকি ২ ভাই খুব দুষ্ট ও বেপরোয়া ছিলেন। পঞ্চাশের দশকের কোনো এক রাতে সিগারেট হাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন রফিক স্যারের যমজ ভাই। মশারিতে আগুন লেগে অগ্নিদগ্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় ৭ দশক পর আরেক ভাই রফিকুল ইসলামের মৃত্যুতে বাংলাদেশে একটি যুগের অবসান হলো।

পুনশ্চ: অন্তর্জালে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের ছবি খুঁজতে গিয়ে দেখলাম তথাকথিত শিশুবক্তা রফিকুল ইসলামের শত শত ছবির ভিড়ে স্যারের ছবি খুঁজেই পাওয়া যায় না। যে জাতির কাছে মুড়ির দর মুড়কির চেয়ে এত বেশি, সে জাতির কপালে যে আরও বহু দুঃখ আছে তা বলাই বাহুল্য।