Main Menu

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পরিবার

Sharing is caring!

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক কতটুকু, তা নিয়ে লেখার ইচ্ছে কোনদিনই ছিলো না। কারণ, যারা অবদান রেখেছেন তারা কোন প্রকার স্বীকৃতির জন্য তা করেন নি। তারা করেছেন নিজের পরিবারের জন্য, নিজের দেশের জন্য। তাদের কাছ থেকে আমরা শিখেছি আত্মপ্রচার নয়, কাজ করে যাওয়া। একজন লেখক হিসেবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাঝেমধ্যে লিখতে হয়। সেখানে প্রসঙ্গক্রমে কিংবা স্বাক্ষী হিসাবে নিজের পরিবারের কিছু কথা মাঝেমধ্যে এসেছে। ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আমার দ্বিতীয় বই ‘জীবন ধর্ম সংস্কৃতি’ থেকে শুরু করে ‘দ্রাবীড় বাংলার রাজনীতি’, ‘লাহোর থেকে কান্দাহার’ এবং ‘সুকুতে মাশরিকি পাকিস্তান’ ইত্যাদিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ক বিভিন্ন প্রসঙ্গ রয়েছে। আমার জানা নেই কোন বাঙালী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে আমার ‘সুকুতে মাশরিকি পাকিস্তান’ বইয়ের আগে উর্দুতে বই লিখেছেন কি না? লিখে থাকলে আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ।
অনেককে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ব্যবসা করতে। অনেক এমনও আছেন যাদের পরিবার একাত্তরে পাকিস্তানিদের পক্ষে বিভিন্নভাবে কাজ করেছেন, বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা বা নির্দেশের পরও তারা পাকিস্তান সরকারকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেছেন। আজ তারা বা তাদের সন্তানেরা মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযোদ্ধাদের ঠিকাদারী নিয়ে বসে আছেন। আমার কোন আপত্তি নেই কেউ যদি দেশপ্রেমের ব্যবসা করেন। কিন্তু কোন কোন সময় দেখা যায় আমাদের শহরে নতুন আগন্তুক কেউ কেউ নাজেনে আবার কেউ কেউ আমাকে গায়েল করতে কৌশল হিসাবে ‘রাজাকার’ কিংবা ‘জামায়াত-শিবির’ বলে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। যারা বলেন তাদের তথ্য নিলে দেখা যায় কারো কারো বাপ-চাচা কিংবা দাদার মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোন সম্পর্কই ছিলো না। আর কারো কারো বাপ-চাচা কিংবা ভাই-দাদা মুসলিমলীগ, জামায়াত, অথবা চীনপন্থী কমিউনিস্টদের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। আর কারো কারো বাপ-চাচা-ভাই-দাদা পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেছেন বঙ্গবন্ধুর নিষেধের পরও। ওদের কেউ কেউ এমন প্রতিষ্ঠানে চাকুরীতে ছিলেন যেগুলোর মূল কাজ ছিলো মুক্তিযোদ্ধা এবং বাঙালীকে দমন এবং পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করা। কারো কারো বাপ-চাচা নির্বোধের মতো ছিলেন পাকিস্তানিদের সাথে, কেউ কেউ ছিলেন এসব ব্যাপারে নির্বোধ। নির্বোধের মতো সত্যের সাথে সম্পর্ক না-থাকা আর জেনে-বুঝে মুসলিমলীগ, জামায়াত, অথবা চীনপন্থী কমিউনিস্টদের সাথে মিলে পাকিস্তানের পক্ষপাত সমার্থক নয়।
যারা আমার দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে কথা বলেন, আজকের এই লেখা আমি তাদেরকে উৎসর্গ করলাম। আমি শুরুতে বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি, আমাদের পরিবারে জামায়াত, মুসলিমলীগ কিংবা চীনপন্থী কমিউনিস্ট একজনও নেই। নেই কোন রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস। বুকে হাত দিয়ে গর্ব করে বলতে পারি, আমার বাপ-চাচা, এমন কি দাদাও সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় জনসমর্থন, আর্থিক সমর্থন আদায়ে এবং সরাসরি যুদ্ধে সিলেট এবং বৃটেনে একই সাথে যে পরিবারের লোকেরা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যমত আমাদের পরিবার অবশ্যই।
আমার শ্রদ্ধেয় দাদা আলহাজ্ব সৈয়দ শামসাদ আলী। আমার বাপ-চাচা ছয়জন। বয়সানুক্রমে¡ সৈয়দ আব্দুল মান্নাফ, সৈয়দ আব্দুল হান্নান, সৈয়দ আব্দুর রহমান, সৈয়দ আতাউর রহমান (আমার বাবা), সৈয়দ লুৎফুর রহমান, সৈয়দ মুজিবুর রহমান। বড়চাচা সৈয়দ আব্দুল মান্নাফ কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত না থাকলেও নিজে পরিবার সামলিয়ে ভাইদেরকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাঁকে আমরা সব চাচাতো ভাই-বোন আদর করে ‘বাবা’ ডাকতাম। আমাদের গ্রামের মানুষ তাঁকে ‘লক্ষী-ময়না’ ডাকতো। পরিবারের অর্থনৈতিক ঝড়-ঝাপটা প্রথম জীবনে তিনি দাদার সাথে মাথায় উঠিয়ে নিয়েছেন। তিনি অবসরে তাবলিগে গিয়ে সময় লাগাতেন। আমার দ্বিতীয় চাচা সৈয়দ আব্দুল হান্নান আদমজী জোট মিলস এ যখন চাকুরী করতেন তখন সেখানে শ্রমিকনেতা ছিলেন মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। আর চাচা ছিলেন আদমজী জোট মিলস-এর শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারী। মাওলানা ভাসানী সভাপতি এবং মাহমুদ আলী সেক্রেটারী হয়ে যখন ন্যাপ গঠন করেন তখন থেকে চাচা ন্যাপের রাজনীতি শুরু করেন। তিনি কোনদিন আদর্শচ্যূত হননি, আজীবন ন্যাপই করেছেন। তাঁকে যদি বলা হয়, ন্যাপে তো আপনি আর মুজাফ্ফর আহমদ ছাড়া কেউ নেই, তখন তাঁর সহজ উত্তর, ‘আমি তো ন্যাপে যাইনি কাউকে দেখে, আমি ন্যাপ করি আদর্শ দেখে।’ তিনি সত্তরের নির্বাচনে ন্যাপ থেকে কুড়েঘর নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন। ন্যাপ ছিলো একাত্তরের স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিভিত্তিক একটি রাজনৈতিক সংগঠন। ন্যাপের মাধ্যমেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে এসে দাঁড়িয়েছিলো। বাংলাদেশের সংবিধান মূলত ন্যাপের রাজনৈতিক রাষ্ট্রের খসড়া। বড়চাচা সৈয়দ আব্দুল হান্নান ছিলেন একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে সুনামগঞ্জের সংগঠক। তিনি ভারতে গিয়েও ট্রেডিং নিয়েছেন। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক তাঁকে দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ ছিলো। পাকিস্তানি সৈনিকরা তাঁর খুঁজে আমাদের বাড়িতে তিনবার আসে। দাদাকে নৌকায় উঠায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। পরে ছেড়ে দেয়। যুদ্ধের বছরই দাদা হজ্ব করেছিলেন। তিনি হজ্বের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বাড়িতে একা বসে থাকতেন। যুদ্ধের নয় মাস আমাদের কোন মহিলা-পুরুষ বাড়িতে থাকতে পারেননি।
একাত্তরে যুদ্ধের সময় আমার তৃতীয় চাচা সৈয়দ আব্দুর রহমান এবং আমার বাবা সৈয়দ আতাউর রহমান ইংল্যান্ড ছিলেন। তারা থাকতেন বার্মিংহামের ১৪২ নাম্বার বোলসালহিথ রোডে। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালিন সময় এই ঘর ছিলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের একটি মিনি অফিস। বোলসালহিথে তারা দুই ভাই মিলে গোসারী সপ চালাতেন। চাচা তো ছিলেন বয়সে বড় এবং বাবা ছিলেন ছোট। তাদের কাছ থেকে শোনা কথা, যখন বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় তখন তারা দুইভাই টেলিভিশনে সংবাদ দেখে কেঁদে কেঁদে একভাই অন্যভাইকে প্রশ্ন করতেন, এখন আমাদের করণীয় কি? তখন তো আর এখনকার মতো মোবাইল, ফ্যাক্স, নেট, ওয়ারসাপ, ভাইবার, ইমু ইত্যাদি ছিলো না। বাড়ির খবর জানা যাচ্ছে না, তাও ছিলো চিন্তার অন্যতম একটি কারণ। লন্ডন হলো বৃটেনের রাজধানী। চাচা লন্ডনে ফোন করেন তাঁর বন্ধু মিম্বর আলীর কাছে। তাদের মধ্যে দেশ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। অবশেষে মিম্বর আলী বলেন, লন্ডনে একজন লোক আছেন যিনি অনেক শিক্ষিত এবং জ্ঞানী, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরি। চাচা মিম্বর আলীকে বললেন, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে। মিম্বর আলী পরেরদিন তাই করলেন। কিন্তু আবু সাঈদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এ জাতি এখনও স্বাধীনতা লাভের যোগ্য হয়নি। বন্ধুর কাছ থেকে একথা শোনে চাচার খুব রাগ আসে। তিনি আমার বাবাকে বলেন, তুমি কি ব্যবসা একা চালাতে পারবে, আমি একটু লন্ডন যাবো বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে? বাবা বললেন, অবশ্যই তুমি যাবে। চাচা রাতে তাঁর বন্ধু আফরুজ মিয়া, সফির আহমদ আর ঠাকুর মিয়াকে সাথে নিয়ে লন্ডন চলে যান। সেখানে গিয়ে প্রথমে মিম্বর আলীকে গাড়িতে উঠান এবং পারে যান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ঘরে। চাচাতো বেশ লম্বা মানুষ, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী চাচার বগলের নীচে থাকতেন। তিনি যখন চাচার মুখোমুখি হয়ে বসতে বলেন তখন চাচা বলেন, আমি আপনার ঘরে বসবো না যদি আপনি আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর না দেন,
১) বঙ্গবন্ধু যে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন তা কি সত্য নয়, তা হলে ওরা কেন ক্ষমতা হস্তান্তর করলো না?
২) পাকিস্তানিরা যে গণহত্যা করছে তা কি জুলুম নয়?
৩ ) আপনি কেন মনে করেন আমাদের জাতি এখনও স্বাধীনতার যোগ্য হয়নি?
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী শিক্ষিত এবং জ্ঞানী মানুষ। তিনি কোন উত্তর না দিয়ে চাচার হাত ধরে বললেন, আমি আপনাদের সাথে যেখানে বলবেন সেখানে যাবো। এই থেকে শুরু হলো বৃটেনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন এবং অর্থ সংগ্রহের কর্মসূচী। তারা গঠন করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ‘একশন কমিটি ফর বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট’। এগারো সদস্য বিশিষ্ট্য একশন কমিটির মধ্যে একজন ছিলেন আমার চাচা সৈয়দ আব্দুর রহমান।
২৮ মার্চ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ একশন কমিটির উদ্যোগে বার্মিংহামের স্মলহিথ পার্কে একটি জনসভার আয়োজন করা হয়। সেই জনসভায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়ানো হয়। বহিবিশ্বে এই প্রথম খোলা আকাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়লো। সেদিন স্মলহিথ পার্কের জনসভায় পাকিস্তানিরা আক্রমন করলে আমার বাপ-চাচারা সরাসরি মারামারিতে অংশ নেন। পাকিস্তানিদের আক্রমনে সেদিন স্মলহিথ পার্কে ১৩জন বাংলাদেশী আহত হয়েছিলেন। ‘একশন কমিটি ফর বাংলাদেশ লিবারেশন মুভমেন্ট’ একদিকে বৃটেনে জনসমর্থন আদায় এবং অর্থ সংগ্রহে কাজ করছিলো, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছিলো। জেনেভা থেকে ব্যারিস্টার নিয়োগ করতে প্রয়োজন টাকার। তৎকালিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ফোন আসে চাচার কাছে। তিনি সাথে সাথে আমাদের আত্মীয়-স্বজন এবং তাঁর বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ১৬শ পাউন্ড সংগ্রহ করে দেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের সেক্রেটারী রেজাউর রহমানের কাছে। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য এই টাকা দিয়েই জেনেভা থেকে প্রথম ব্যারিস্টার নিয়োগ করা হয়। চাচা ছিলেন তখন বার্মিংহাম শহর আওয়ামীলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। সেই সময় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম লন্ডন সফরে গেলে চাচা নিজ হাতে তাঁর কাছে ৫০৪ পাউন্ডের একটি চেক দেন বাংলাদেশের জন্য, যা তৎকালিন দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় ছবি সহ প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য আমাদের বাপ-চাচা এবং তাদের বন্ধু-বান্ধবরা একদিকে গোটা বৃটেন সফর করেছেন, অন্যদিকে বৃটিশ সরকারের কাছ থেকে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন।

সর্বপ্রথম ইংল্যান্ডের ‘হাউস অফ কমন্সে’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায় করতে যে ছয়জনের গ্র“প ‘ডরিশ পিশা’র এমপিকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের অন্যতম আমার চাচা সৈয়দ আব্দুর রহমান। মূলত তিনিই ছিলেন এর মূল উদ্যোগতা। ডরিশ পিশার এমপি ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু। বাকী পাঁচজন হলেন, শাহ নুরুল ইসলাম, আতিক মিয়া, আজির পাশা, প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সেক্রেটারী রেজাউর রহমান ও ইসমাঈল আলী। এই ছবিও আমাদের কাছে রয়েছে।
২৭ জুন ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বার্মিংহাম শহরের Mayfeir hall-এ বাংলাদেশের সমর্থনে যে পাবলিক মিটিং হয় তার মূল অর্গেনাইজারদের মধ্যে ছিলেন আমার বাপ-চাচাও। চাচাতো নেতা ছিলেন। পাকিস্তানি কমিউনিটির সাথে চলছিলো এই মিটিং নিয়ে অনেক উত্তেজনা। আমার বাবা এবং আমাদের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন সেদিন মিটিং চলাকালিন সময়ে একপায়ে হলের গেটে দাঁড়িয়ে পাহড়াদারি করেছেন। বার্মিংহামের বলসলহিথ বড় মসজিদ ছিলো বাঙালী-পাকিস্তানিদের যৌথ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আর একসাথে চলা অসম্ভব হয়ে যায়। তখন আমার চাচাকে সভাপতি করে বাঙালীদের জন্য মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চাচা রাতারাতি স্মালহিথের কভেন্ট্রি রোড একটি নাইটক্লাব খরিদ করে মসজিদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন, যা বর্তমানে বার্মিংহামের বড় মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আমার ছোটচাচা সৈয়দ লুৎফুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ছাত্রলীগের সদস্য, অতপর আজীবনের আওয়ামীলীগার। বর্তমানে বার্মিংহাম আওয়ামীলীগের নেতা। সবছোট চাচা সৈয়দ মুজিবুর রহমান ছাত্র জীবনে ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের নেতা এবং এমসি কলেজের ভিপি। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে। তিনি রচডেল আওয়ামীলীগের সাথে সম্পৃক্ত। এই হলো আমার আপন বাপ-চাচার কথা। আর বাপের চাচাতো ভাইদের মধ্যে সৈয়দ রাছ মিয়া ( যিনি আমাদের ফুফাও। কবি মিলু কাসেম, লিলু কাসেম ও ছড়াকার দিলু নাসেরের আব্বা) এবং সৈয়দ আব্দুল মুহিত ( লেখক সৈয়দ জগলুল পাশা, লন্ডন প্রেসক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাহাশ পাশার আব্বা)ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে প্রচুর শ্রম দিয়েছেন। আমার বাবার চাচাতো ভাই সৈয়দ আব্দুল মালিক, যিনি বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট শাখার ম্যানাজার ছিলেন। ছাত্র সময়ে আয়ূব বিরোধী আন্দোলনে তাঁর পায়ে গুলি লেগেছিলো। আজীবন তিনি খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেটেছেন। অতঃপর কেউ যদি প্রশ্ন করেন আমার ভূমিকা কি ছিলো একাত্তরে, তবে জেনে রাখুন, আমি তখন এক বছরের শিশু, বাবা বিদেশ, মায়ের কুলে বাড়ি ছাড়া। এর অতিরিক্ত আর কোন ভূমিকা আমি রাখতে পারিনি।
মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে আমাদের পরিবারে আজও কোন আপোষ নেই। আমাদের পরিবারের কেউ ভুলেননি, একাত্তরের নয় মাস আমাদের বাড়ি শুধু পুরুষশূন্য নয়, নারীশূন্যও ছিল। পাকিস্তানী বর্বরদের কাছে নিজকে মুসলমান প্রমাণের জন্য আমার দাদার হজ্বের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে সারাদিন বারান্দায় বসে থাকা, তারপরও নিজ ছেলেদের মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার অপরাধে পাকিস্তানীরা তিনবার বন্ধি করে তাঁকে নৌকায় উঠানো, অতপর হজ্বের পার্সপোট আর বয়সের কারণে ছেড়ে যাওয়া। পেট্রোল দিয়ে তিনবার বাড়ি জ্বালানোর চেষ্টা। বড়চাচার উপর দেখামাত্র গুলির নির্দেশ। ইংল্যান্ডে পাকিস্তানিদের সাথে মারামারি। যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানীদের সাথে সবকিছু পৃথক করা, নতুন ব্যাংক , নতুন মসজিদ, নতুন ওয়েলফেয়ার ইত্যাদি তৈরি করা। কিছুই তো আমাদের পরিবার ভুলেনি। বৃটেনে শুধু আমাদের পরিবার নয়, প্রায় সকল বাঙালী একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। বৃটেনে রাজাকারদের মধ্যে যারা গিয়েছেন তাদের বেশিরভাগই একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর গিয়েছেন। এখানে আমাকে স্মরণ করতে হয় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বৃটেনের কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দানকারি প্রধান ব্যক্তি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর একটি উক্তি। তিনি বলেন, স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমগ্র গ্রেট ব্রিটেনে বাঙালিদের মধ্যে বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রায় প্রতিটি বাঙালি এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বিভিন্ন এলাকায় কমিটি গঠন করে।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*