Main Menu

ইসলামে মুসাফাহার বিধান

Sharing is caring!

ইসলাম সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তরিক ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ মানবিক-মানবতার ধর্ম, যা ইসলামের শুরু থেকে আজ অবধি যুগে যুগে প্রমাণিত। ইসলামের সব কার্যক্রমে, আচার-ব্যবহারে, লেনদেনে, ব্যবসা-বাণিজ্যে এমন নীতি ও নৈতিকতা বাস্তবায়ন করেছে, যার ফলে মানুষের বন্ধনের অটুটকে দৃঢ় থেকে দৃঢ় করে। অনৈক্য-বিচ্ছেদ, ঝগড়া-ফ্যাসাদ ইসলাম ঘৃণ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসলাম মানুষে মানুষে ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যমগুলো উদ্ভাসিত করেছে। শিখিয়েছে নানাভাবে। যেন জগতে মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারে। একে অপরের মধ্যে ভালোবাসা প্রকাশ ও বন্ধনকে মজবুত করার অনেকগুলো মাধ্যম রয়েছে। তার অন্যতম একটি একে অপরকে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্ভাষণ জানানো।

ইসলামে হাতে হাত মেলানো বা মুসাফাহা : সম্ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মুসাফাহা, যা আন্তরিকভাবে হাতে হাত মেলানোর মাধ্যমে প্রকাশ পায়। একেই মুসাফাহা বলে। হজরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, যখন ইয়ামেনবাসী আগমন করল, তখন রাসুল (সা.) বলে উঠলেন ‘ইয়ামেনবাসী তোমাদের কাছে আগমন করেছে।’ হজরত আনাস (রা.) বলেন ‘ইসলামে এরাই সর্বপ্রথম মুসাফাহা আনয়ন করেছিল।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৫২১৩)।

মুসাফাহা সাহাবি যুগে : বিভিন্ন হাদিস ও ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায়, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) এর মধ্যে মুসাফাহার ব্যাপক প্রচলন ছিল। হজরত আবুল খাত্তাব কাতাদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি হজরত আনাস (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম ‘রাসুল (সা.) এর সাহাবিদের মধ্যে কি মুসাফাহা করার প্রথা ছিল?’ তিনি বললেন ‘হ্যাঁ।’ (বোখারি : ৬০৬৩)।

মুসাফাহা করা সুন্নত : মুসাফাহা করা একটি সুন্নত বিধান। রাসুল (সা.) এর বিভিন্ন হাদিস দ্বারা এটি প্রমাণিত। মুসাফাহা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাষণ জানানোর অন্যতম একটি ইসলামি রীতি। হজরত আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এর দরবারে একজন এসে বলল ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমাদের মধ্য থেকে কোনো লোক তার ভাইয়ের সঙ্গে কিংবা বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তার সামনে কি মাথা নত করবে?’ তিনি বললেন ‘না’। সে বলল ‘তাহলে কি তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে?’ তিনি বললেন ‘না’। সে বলল ‘তাহলে কি তার হাত ধরে তার সঙ্গে মুসাফাহা করবে?’ তিনি বললেন ‘হ্যাঁ’। (তিরিমিজি : ২৭২৮)।

মুসাফাহায় গোনাহ মাফ হয় : মুসাফাহা ইসলামের শরিয়তসিদ্ধ একটি প্রথা। মুসলমানের প্রত্যেক ভালো কাজের জন্য রয়েছে সওয়াব। সম্ভাষণ জানানোর ক্ষেত্রে যেমন দুনিয়ায় একে অপরের বন্ধন দৃঢ় করে, ঠিক আখেরাতে রয়েছে তার জন্য গোনাহ মাফের সুসংবাদ। হজরত বারা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন ‘দুজন মুসলিম সাক্ষাৎকালে মুসাফাহা করলে একে অপরের থেকে পৃথক হওয়ার আগেই তাদের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (সুনানে আবি দাউদ : ৫২১২-৫২১১)।

মুসাফাহার নিয়ম : মুসাফাহা হবে দু’হাত দ্বারা। চার হাতের মিলনের মাধ্যমে প্রত্যেকের একটি হাত অপরজনের দু’হাতের মধ্যে থাকবে। যেমন রাসুল (সা.) এর আমল ছিল। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন ‘রাসুল (সা.) আমাকে তাশাহুদ শেখালেন এমতাবস্থায় যে, আমার হাত রাসুল (সা.) এর উভয় হাতের মধ্যে ছিল।’ (বোখারি : ৫৯১০)। হাদিসটি ইমাম বোখারি (রহ.) মুসাফাহা অধ্যায়ে এনেছেন। এরপর তিনি ‘বাবুল আখ্জ বিল ইয়াদাইন’ (উভয় হাত ধরা) শিরোনামে একটি পরিচ্ছেদ স্থাপন করেছেন। তাতে হাম্মাদ ইবনে জায়েদ (রহ.) এবং আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) এর মুসাফাহার পদ্ধতি এভাবে উল্লেখ করেছেন ‘তারা উভয় হাতে মুসাফাহা করেছেন।’ সুতরাং এক হাতে মুসাফাহা সুন্নত নয়। উম্মতের দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক আমলও হলো দু’হাতে মুসাফাহা করা। অনেকে মনে করেন, মুসাফাহার সময় হাতে হালকা চাপ দিতে হয়। ইসলামে মুসাফাহার এমন কোনো নিয়ম নেই। হাত হালকা ঝাড়া দেওয়ার কথা কোনো কোনো কিতাবে থাকলেও তা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায় না। আবার অনেকে মনে করেন, মুসাফাহার পর নিজের হাতটি এনে নিজের বুকে লাগাতে হয়। শরিয়তে এ ধরনের কোনো নিয়ম নেই। তাই তা থেকে বিরত থাকা উচিত। (ফতোয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত : ১২/১১৯-১২০)।

এক হাতে মুসাফাহা বা হ্যান্ডশেক : মুসলমানদের মধ্যে উভয় হাতে মুসাফাহা করার পদ্ধতিটি উম্মাহর একটি নিরবচ্ছিন্ন কর্মধারা, যা যুগ পরম্পরায় স্বীকৃত। ইংরেজ আমলের শুরুর দিকেও মুসলমানরা পরস্পর সাক্ষাতের সময় দুই হাতে মুসাফাহা করত; আর ইংরেজরা করত এক হাতে। যাকে মূলত তারা ‘হ্যান্ডশেক’ বলে অভিহিত করত। ইংরেজদের এ প্রথাকে সর্বপ্রথম গ্রহণ করে তখনকার আধুনিক শিক্ষিতরা। তারা কলেজ-ভার্সিটিতে এক হাতে মুসাফাহা করার রেওয়াজ চালু করে। অবশ্য এটাকে তারা ইংরেজদের পদ্ধতিই মনে করত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেসব আধুনিক শিক্ষিতদের অনুসরণ করে কথিত আহলে হাদিসরাও নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য শুধু এক হাতে মুসাফাহা করার রীতি বের করে। ফলে মুসাফাহা আজ মুসলমানের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির পরিবর্তে ঝগড়া-বিবাদ ও বিভক্তির মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মুসাফাহায় দোয়া করা : মুসাফাহা করার সময় একে অপরের জন্য দোয়া করা চাই। এটি রাসুল (সা.) এর আমল ছিল। হজরত হুজায়ফা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন ‘রাসুল (সা.) যখনই তাঁর সাহাবিদের কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তার সঙ্গে মুসাফাহা করতেন এবং তার জন্য দোয়া করতেন।’ (সুনানে নাসাঈ : ২৬৭)। তাই মুসাফাহার সময় ‘ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম’ পড়ে একে অপরের জন্য দোয়া করা চাই। (ফতোয়ায়ে ফকিহুল মিল্লাত : ১২/১২১)।

পরনারীর সঙ্গে মুসাফাহা : ইসলামে বেগানা নারীর সঙ্গে মুসাফাহা করার অনুমতি নেই। হজরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন ‘তারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করবে না।’ এ আয়াত পাঠ করে রাসুল (সা.) স্ত্রীলোকদের কাছ থেকে বাইআত নিতেন। ‘কিন্তু যাদের হাতে হাত দেওয়া বৈধ, এমন মেয়েলোক ছাড়া তিনি অন্য কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেননি।’ (বোখারি : ৭২১৪)।

বিদায়কালে মুসাফাহা : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন ‘কোনো লোককে রাসুল (সা.) বিদায় দেওয়ার সময় তাকে নিজের হাতে ধরতেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে নিজের হাত রাসুল (সা.) এর থেকে না ছাড়াতেন, ততক্ষণ তিনিও তার হাত ছাড়তেন না।’ (তিরমিজি : ৩৪৪২)।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, আল জামিআতুল ইসলামিয়া ইসলামপুর (ভবানিপুর মাদ্রাসা), গোপালগঞ্জ






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*