Main Menu

অধ্যায়, বার্মিংহামের স্মরণসভায় বক্তারা

আল মাহমুদ: বাংলা সাহিত্যের একক অভিযাত্রী

Sharing is caring!

বাংলা সাহিত্যের অনেক কবির ভিড়ে, বিশেষ করে নাগরিক কবিদের মধ্য থেকে আল মাহমুদ ছিলেন আলাদা ও স্বতন্ত্র এক কবি সত্ত্বা। ৫০ এর দশকে যে ক’জন কবি বাংলা সাহিত্যের বাঁকবদলে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। বিশেষ করে ৫০ এর দশক, যা ছিলো আমাদের সাহিত্যের মাইলফলক। মনে প্রাণে কবি ছিলেন সেই দশকের কবিরা আর আল মাহমুদ ছিলেন তাদের মধ্যে শেষ নক্ষত্র। তবে বিশ্বসাহিত্যে যতটুকু পাওয়ার কথা ছিলো তা তিনি পাননি কারণ তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। অধ্যায়, বার্মিংহামের স্মরণ সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, আল মাহমুদ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একক অভিযাত্রী।
অধ্যায়, বার্মিংহামের আয়োজনে ‘পঞ্চাশের শেষ নক্ষত্র আল মাহমুদ’ শীর্ষক স্মরণসভায় বক্তারা সদ্য প্রয়াত বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র কবি আল মাহমুদ সম্পর্কে এভাবে তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, আল মাহমুদ কবিতার বাইরে সার্থক গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ভ্রমণকাহিনীও লিখেছেন। তবে সবকিছুর উপরে নিজেকে তিনি কবি ভাবতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। তাই প্রায়ই বলতেন, আমিতো কবি মাত্র। আরো বলতেন, কবিতা কালের কণ্ঠ। আমন্ত্রিত কবি হিসেবে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেন ‘কবিতার জন্য বহুদূর’। ১৯৯৬ সালে বৃটেন সফরের পর ‘কবিতার জন্য সাত সমুদ্র’ শিরোনামের ভ্রমণকাহিনীতে নগরজীবন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেন – ‘সত্যি পৃথিবীর মহানগরীগুলো মানুষকে তার স্বাভাবিক জীবনচর্চা ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বৈকি।’ নাগরিক ব্যস্ততা সম্পর্কে তাঁর এই মূল্যায়ন অমুলক নয়। তবে শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও সত্যিকারের কাব্যপ্রেমীরা কবিতাকে, কবিকে একেবারেই ভুলে যেতে পারেন না। বিশেষ করে তাঁর মতো বিশিষ্টতায় বহুমাত্রিক কবিকে। তারই প্রমাণ রাখতে সক্ষম হন নগর বার্মিংহমের অধ্যায়ের কবি ও কাব্যপ্রেমিক বন্ধুরা। তারা সকল ব্যস্ততাকে উপেক্ষা আয়োজন করেন ‘পঞ্চাশের শেষ নক্ষত্র কবি আল মাহমুদ’ শীর্ষক এক শৈত্তিক ও সার্থক স্মরণসভা।
গত ১৭ মার্চ, রোববার বার্মিংহামের পিকাডেলি হলে কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি, স্বরচিত লেখা পাঠ ও আলোচনার মাধ্যমে স্মরণ করা হয় সদ্য প্রয়াত বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি আল মাহমুদকে। সন্ধ্যা ৭টায় আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় সভার। কবির কালজয়ী ছড়া ও কাব্যসঙ্গীতের তেজোদীপ্ত ও সংবেদনশীল সুরলহরীর মধ্যদিয়ে সূচনা হয় স্মরণসভার।

পুরো অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় ছিলেন ভরাট কণ্ঠের অধিকারী বিশিষ্ট ছড়াকার দিলু নাসের। উপস্থাপনার ফাঁকে ফাঁকে আল মাহমুদের বিখ্যাত ‘প্রভাত ফেরী প্রভাত ফেরী’ শীর্ষক কবিতায় সুরের অনুরণন তুলেন শিল্পি ও সংস্কৃতিকর্মী সাইফুর রাজা চৌধুরী পথিক। অনুষ্ঠানে ‘মহাকালের কবি আল মাহমুদ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট কবি ও সাংবাদিক সারওয়ার-ই আলম। প্রবন্ধের উপর আলোচনায় অংশ নেন সাপ্তাহিক সুরমার সাবেক সম্পাদক, শক্তিমান কবি আহমদ ময়েজ ও বিশিষ্ট সাংবাদিক কাজী জাওয়াদ।
প্রবন্ধের সূচনায় সারওয়ার-ই আলম বলেন, আধুনিক বাংলা কবিতাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন যে ক’জন কবি আল মাহমুদ তাদের একজন। জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের ঘনঘোর অমানিশায় এই কবির আবির্ভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, কবিতা বিমুখ মানুষকে কবিতামুখী করেছেন আল মাহমুদ। আর তিনি তা করতে পেরেছিলেন তাঁর প্রাঞ্জল ভাষা, স্বদেশপ্রেম, লোকজ ঐতিহ্যের কাব্যালঙ্কার, অস্ফুট প্রেম ও ভালোবাসার নান্দনিক প্রকাশ – সর্বোপরি এক মোহাবিষ্টতা দিয়ে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, আবহমান বাংলার লোকজ জীবন, প্রাগৈতিহাসিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, বাঙালির গণ-অভ্যুত্থান, ভাষা আন্দোলন ও মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে উপজীব্য করে, ধর্মীয় কুপম-ুকতার নাগপাশ ছিন্ন করে নিরঙ্কুশ প্রেম ও ভালোবাসার মাধ্যমে মানবিক সম্পর্ক নির্মাণ এবং শ্রেণী বৈষম্য উচ্ছেদ করে সুষম সমাজ প্রতিষ্ঠার দুর্বার আহবান বার বার উচ্চারিত হয়েছে তার কবিতা, গত্ত, ছড়া ও উপন্যাসে।
যে কাব্যগ্রন্থ আল মাহমুদকে সবচেয়ে বেশী নন্দিত করে ও খ্যাতি এনে দেয় সেই ‘সোনালী কাবিন’কে বহুমাত্রিক কাব্যসুষমা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রবন্ধকার সারওয়ার-ই আলম।
দীর্ঘ প্রবন্ধের শেষাংশে এসে তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্যের এ নক্ষত্র, মহাকালের এ কবি তাঁর কাব্য-সত্ত্বার কারণেই প্রিয় দেশ ও দেশের মানুষের মানসপটে বেঁচে থাকবেন শতাব্দীর পর শতাব্দী।
আলোচনায় অংশ নিয়ে কবি আহমদ ময়েজ বলেন, নাগরিক কবিদের মধ্যে কবি আল মাহমুদ ছিলেন আলাদা ও স্বতন্ত্র। আল মাহমুদ সেই ৫০ দশকের শেষ নক্ষত্র, যে দশক বাংলা সাহিত্যের মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। তিনি বলেন, সেই দশকের সবাই মনে-প্রাণে কবি ছিলেন।
আহমদ ময়েজ আরো বলেন, কবি আল মাহমুদ কবিতা লেখার পাশাপাশি ছড়া, গত্ত, উপন্যাস ও প্রচুর প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে গেছেন। তিনি যা-ই লিখেছেন তা শৈত্তিক মানোত্তীর্ণতায় সবার মনন ছুঁতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর ছড়াগুলোও কবিতার মতো।
তিনি বলেন, আল মাহমুদ তরুণদের লেখালেখির ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় প্রান্তিক জনপদকে স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং তিনি বাংলার বৃহদাংশ গ্রামীণ জীবনাচারকে সার্থকভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন।
আরেক আলোচক সাংবাদিক কাজী জাওয়াদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, বিশ্বসাহিত্যে যতটুকু পাওয়ার কথা তা তিনি পাননি। কারণ তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন।
এযুগের অন্যতম কবি প্রতিভা আল মাহমুদ মন্তব্য করে তিনি বলেন, তাঁর সাথে কবি সিমা সিনির সাথে তুলনা করা যায়। তবে সিমা আত্মসমর্থক ছিলেন আর আল মাহমুদ ছিলেন ইতিবাচক ও আত্মপ্রত্যয়ী কবি।
কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন বিলেতের বিশিষ্ট ও সুপরিচিত আবৃত্তিকারগণ। চ্যানেল এস এর সিনিয়র সংবাদ উপস্থাপক, কবি তৌহিদ শাকীল আবৃত্তি করেন ‘এই পতাকার সূর্য সাক্ষী’। টিভি ওয়ানের প্রোগ্রাম উপস্থাপক জিয়াউর রহমান সাকলাইন আবৃত্তি করেন ‘জেলখানার গেটে দেখা’ কবিতাটি। ইক্বরা টিভির প্রোগ্রাম উপস্থাপক মোস্তফা জামান নিপুন আবৃত্তি করে শোনান আল মাহমুদের কবিতা সম্পর্কিত কবিতা ‘কবিতা এমন’ এবং সংস্কৃতিকর্মী উর্মিলা আফরোজ আবৃত্তি করেন ‘নোলক’ শিরোনামের কবির বিখ্যাত কবিতাটি।
স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন কবি সৈয়দ ইকবাল, কবি মনোয়ার আহমদ, কবি সৈয়দ রুম্মান, কবি কাইয়ূম আবদুল্লাহ, কবি মুহাম্মাদ শরীফুজ্জামান, কবি সৈয়দ মাসুম ও কবি জোসেফ খান। এছাড়াও দুই শিশু শিল্পী নিশীথ ও নিবিড় আল মাহমুদের বিখ্যাত ছড়া ‘আম্মু বলেন পড়রে সোনা/ আব্বু বলেন মন দে/ পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠালচাঁপার গন্ধে’ পাঠ করে।
অধ্যায়, বার্মিংহামের পক্ষে শুরুতে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বাংলা ভয়েস সম্পাদক, প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ মারুফ এবং সমাপ্তি লগ্নে স্মরণসভার সফলতার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলামেইল সম্পাদক, ছড়াকার সৈয়দ নাসির আহমদ।
অনুষ্ঠান সফল করতে অন্যান্যদের মধ্যে সহযোগিতা করেন এলাহি হক সেলু, জিয়া উদ্দিন তালুকদার, আতিকুর রহমান, আশরাফুল ওয়াহিদ দুলাল, গোলাম মোস্তফা লিমন, সৈয়দ নাদির ও সৈয়দ মাসুম।
স্মরণসভা উপলক্ষে প্রায় দুই ফর্মার একটি দৃষ্টিনন্দন স্মারক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় যাতে কবিকে নিবেদন করে বিলেতের লেখকদের কবিতা ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ-নিবন্ধ স্থান পায়।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*