Main Menu

আনন্দময়ী মজুমদারের তিনটি কবিতা

Sharing is caring!

উন্মাদিনী

উন্মাদিনী, আয়,
সুধার তালাশে তোর
রাত হবে ভোর।

মা-হারা রাতে
বুকঢালা বারি আছে
ভোরের প্রপাতে।

শব্দ চেনে বাড়ি।
শব্দেরা দুয়ার খুলে
হাজার-দুয়ারি।

উন্মাদিনী, আয়,
তোর চড়ুই স্বজন।
হৃদয় জানায়
তার চাঁদ প্রয়োজন।

দেখি ঝড়জলে ভিজে যাবে
দগ্ধতার হাত।
ঘুঘুরা পাহারা দেয়
শিশুঘাতী রাত।

উন্মাদিনী, আয়,
নিরাময় মধু এনে
রাখে তোর বোন।
তার সাথে তোর আজ
রক্ষা-বন্ধন।

আর্টিস্ট


চোখ মুদে থাকতে থাকতে আমি পাহাড় হয়ে গেছি। শিশুকে বলেছি, বলো, আমি পাহাড়। শিশু এখনো আমাকে অপার বিশ্বাসের চোখে দেখে, তাই সে কথাই বলে। আমি বলি, বলো, আমি ফুল। বলো, আমি নীল আকাশ। আমি এক টলটলে দীঘি। শিশুর সঙ্গে এইভাবে পাহাড়, ফুল, অনন্ত আর স্বচ্ছ জল হতে আমার ভালো লাগে। মেঘের মত ঘুম নামে। সেই ঘুমের নাম একটা লেবু রঙের প্রজাপতির দুই দণ্ড মধু।


অনেক আগে কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসে যেতে যেতে মাটিতে মেঘ জলে মেঘ আর ধান ক্ষেতে মেঘের ছায়া দেখতে পেতাম। যখন আমার কাছ থেকে কপোতাক্ষর কালো জল হারিয়ে গেল, তখন বয়ে যেতে যেতে মেঘলোকে বর্ষীয়ান ছায়াপথের হাসির কাছে এসেছিলাম। তাঁর স্বর ছিল আমার বাবার মতন। পৃথিবীর ওপর তাঁর হাঁটা ছিল কুসুম ছড়ানো। তাঁর সামনে ছিল এক মাঠ ফিলিস্তিন আর ইজরাইল। এক হাজার শিশু হত্যাকারী। তারা দয়া খুঁজছিল। নিজেদের কাছে পাহাড়ের মত নত আর উজাড় হয়ে তাঁরা চোখ মুদে কাঁদছিল। আমিও কিছু না বুঝে কাঁদতে লাগলাম।


খুব ভালো করে লক্ষ না করেও আমরা চোখ লক্ষ করি। একজন আর্টিস্ট আছেন তিনি ছবি আঁকেন না। সমস্ত জীবনকে বর্ণিল ক্যানভাস করেছেন। তার জান তিনি আলম্ব পেতে দিলেন গ্যালারিতে ঘুমের মতন। কেউ এসে স্পর্শ করল, কেউ অবাক বিস্ময়ে ছুঁয়ে দেখল। কেউ ঠেলা দিল। কেউ জামা খুলে নিল। কেউ ছুরি দিয়ে কাটল। এই আর্টিস্ট মানুষের গহীন বেদনাকে শরীরের ক্যানভাসে একত্র করলেন। তাই কুসুমের মত ফুটে উঠল সেই মানবিক ক্ষত তাঁর অঙ্গ জুড়ে।

এই আর্টিস্ট আমাদের শেখালেন চোখের গহনে তাকাতে। অচিন পাখির চোখের দিকে তাকাতে গিয়ে আমি টের পেলাম সে অচিন নয়। চোখ দিয়ে রক্ত পড়ে অশ্রুর মত। আমি তো তার শিশুকে নিরালম্ব সরল ঘাসের আড়ালে খেলতে দেখলাম। আড়াল প্রিয় গাছের শয্যা। আমি টের পেলাম চোখ দরজা, চোখ মন্দির, চোখ মসজিদ। এই আর্টিস্ট দেখাতে আসেননি। দেখতে এসেছেন। তাঁর দেখা আমাদের দরজা খুলে দিল। আমার শিশু যতদিন আমার সমান লম্বা না হয়, আমি হাঁটু গেড়ে বসি। চোখে চোখ রাখার জন্য। সে দরজায় আমাকে দেখে নিশ্চিন্ত হয়। আমি জানিয়ে দিই, আমার ধূলিকণা আমার চোখের ভিতর সে পাবে। আমাকে সে জিজ্ঞেস করে, তোমাকে কখন আসি বলব। দরজায়, নাকি হাত ছেড়ে চলে যাবার সময়।

কবিতা

কবিতার কাছে নতজানু হয়েছিলাম। ভোরের বেলা শিশির ঝরার অপেক্ষা। সূর্যোদয়ের হাত, কপাল, ঠোঁট আর বাহুতে লেগেছিল পরাগ কবিতা। আমি অপেক্ষা করছিলাম। কতক্ষণে শাঁখ বাজবে। সাগর স্বপ্ন বুনবে। কতক্ষণে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ডানা মেলবে রোদ। কতক্ষণে শূন্যতার কাছে পৌঁছবে জল। চোয়ালে সূর্য নিয়ে কবিতা এসেছিল। আদ্দির পাঞ্জাবি। কবিতা এসেছিল। পদযুগলে পদ্ম মেখে কবিতা এসেছিল। চোখ ছলছল কবিতা এসেছিল। একটা উদাত্ত মাঠের ওপারে ঘন কালো নদী, কবিতা এসেছিল। বাঁশবন মঞ্চে কবিতা এসেছিল। শিরশির ঝিরঝির রাতে। নির্বাক মৃত্যুর ওপার থেকে। ফুটন হলুদ কালো গাড়িতে। পুজোর একাকীত্বে। কবিতা। ওঁরা বেড়াতে যেত এক সময় ঘর হতে শুধু দুই পা। শুধু দুই। পাহাড় ডিঙিয়ে একবার কবিতা এসেছিল লাইব্রেরীর লুকোনো পাতায়। এক গাল হাসি আর দুই টোল। দুঃখভরা চোখেই বারবার। কখনো কখনো রোদের ছলনায়। এক বাগান ফুল ছিল ফুটে। সবাই গোলাপ। সবাই সুন্দর। পা দুটো ডুবিয়ে বসে থাকতে থাকতে কেন যেন একটা ছবি তুলে নিল কেউ, কবিতার। জংলি ফুলের কাছে দু চোখ ভরা আশার ছবি তুলে নিল। বেগনি ফুল। বন্ধুরা বলল, কবিতারা এরকম জংলি হয়। বন্ধুরা বলল, কবিতার চোখে মায়া থাকে, মমতা, এই রকম। আর বাঁক ফিরলেই, থাকে বন্ধুত্ব। বাহুতে ঝকঝক করে শক্তি, লাজুক। হয়ত সেটা মিথ্যে কথা। কাতরতার উদ্যান ছাড়িয়ে কবিতা হয়ে যায় শুধু বোবা মরুদ্যান। আর কিছু থাকে না। বন্ধুরা বলেছিল, কোনো কিছুর কোনো মানে নেই। সেটাই কবিতা। তুমি শুধু ফুটে থাকো। ফুটে থাকো।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*