Main Menu

জড়িত রেকর্ডকিপার বরখাস্ত

আঙুলের ছাপ জালিয়াতি করে ৩ শতাধিক পাসপোর্ট

আঙুলের ছাপ জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) ইস্যু করেছে পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদফতরের একটি দুর্নীতিবাজ চক্র।

মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে এ ধরনের প্রায় তিনশ’ পাসপোর্ট ইস্যুর প্রমাণ পেয়েছে পাসপোর্ট অধিদফতর। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে একজন কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকিদেরও চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। জানতে চাইলে পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাসুদ রেজওয়ান বলেন, ‘আমরা যখন ঘটনার সংবাদ পেয়েছি দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

একজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কেউ যদি জড়িত থাকে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা আপনাদের মাধ্যমে এটা স্পষ্টভাবে বলতে চাই অনিয়ম-দুর্নীতি করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

সূত্র জানায়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস থেকে আঙুলের ছাপ ছাড়াই মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট ইস্যু করা হচ্ছে- এমন গুরুতর অভিযোগ পাওয়ার পর চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত শুরু হয়।

অধিদফতরের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার (ডাটা সেন্টার) যাচাই করে দেখা যায়, অন্তত ৩০৮টি পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। অন্তত ২০টি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে কোনো ধরনের আঙুলের ছাপ না নিয়েই।

আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে চার আঙুলের ছাপ নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নেয়া হয়েছে মাত্র দুটি আঙুলের ছাপ। এমনকি অন্তত ১১টি পাসপোর্ট ইস্যুর পর এ সংক্রান্ত ডকুমেন্টও মুছে ফেলা হয়।

এ সংক্রান্ত তদন্ত রিপোর্টে উঠে আসা তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এভাবে জালিয়াতি করে যারা পাসপোর্ট নিয়েছেন তাদের অনেকের মুঠোফোন নম্বরসহ অনেক কিছুই ভুয়া।

তবে এভাবে পাসপোর্ট নিয়ে কেউ দেশের বাইরে গিয়ে থাকলে তিনি আর বৈধভাবে দেশে ফিরতে পারবেন না। কারণ ইতিমধ্যে এসব পাসপোর্ট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অধিদফতর। জালিয়াতি করে পাসপোর্ট নেয়া ব্যক্তিদেরও এক পর্যায়ে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

পাসপোর্ট অধিদফতরের এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন ঢাকা বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি মহাপরিচালক বরাবর ১৭ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

তদন্ত প্রতিবেদনের দশ পাতার একটি কপি সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের হাতেও আসে। এতে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের রেকর্ডকিপার মোফাজ্জেল হোসেন সন্দেহাতীতভাবে এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত। ঘুষের বিনিময়ে তিনি পাসপোর্ট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

সূত্র জানায়, রেকর্ডকিপার মোফাজ্জেল হোসেন চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে যোগ দেন। শুরু থেকেই তিনি নানা ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

এমনকি তিনি প্রকাশ্যেই বলতেন, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস থেকে তিনি কোটিপতি হবেন।

তদন্ত কমিটির কাছে দেয়া উচ্চমান সহকারী মুসলিমা বেগম তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘অফিসের এক অনুষ্ঠানে তার স্বামীকে রেকর্ডকিপার মোফাজ্জেল হোসেন জানিয়েছিলেন, নারায়ণগঞ্জ অফিসে দুই বছর থেকে তিনি এক কোটি টাকা নিয়ে যাবেন।’ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ জন্য মোফাজ্জেল হোসেন দেশব্যাপী একটি অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জালিয়াত চক্রের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করত। তাদের আবেদনপত্র গ্রহণ থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রক্রিয়ার কাজ হতো অত্যন্ত গোপনে।

তদন্তে উঠে আসে নওগাঁ, বাগেরহাট, সাভার, সাতক্ষীরা, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের বহু লোক নারায়ণগঞ্জ অফিস থেকে পাসপোর্ট করিয়েছেন। যাদের বেশির ভাগই জালিয়াতির মাধ্যমে আঙুলের ছাপ দেননি।

সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির সদস্যরা জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট নেয়া ব্যক্তিদের সঙ্গেও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।

মকবুল হোসেন নামের একজন পাসপোর্টধারী তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকার করেন, ২১ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে তিনি আঙুলের ছাপ ছাড়াই পাসপোর্ট পেতে সক্ষম হন।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের অন্তত ৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী সাক্ষ্য দেন। এদের মধ্যে উপসহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান, উচ্চমান সহকারী মুসলিমা বেগম, অফিস সহকারী মিজানুর রহমান, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কাইছুল ইসলাম, অফিস সহকারী শাহজালাল ও আবুল কালাম আজাদ এবং রেকর্ডকিপার মনজিল হোসেনসহ সবাই জালিয়াতির সঙ্গে মোফাজ্জেল হোসেনের জড়িত থাকার তথ্য তুলে ধরেন। এছাড়া তদন্ত কমিটি জানতে পারে, আঙুলের ছাপবিহীন প্রতিটি পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়েছে।

তবে অভিযুক্ত রেকর্ডকিপার মোফাজ্জেল হোসেন তদন্ত কমিটির কাছে দেয়া তার জবানবন্দিতে দাবি করেন, এ ঘটনার সঙ্গে তিনি মোটেও জড়িত নন। কেউ তার পাসওয়ার্ড চুরি করে আঙুলের ছাপ জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট ইস্যুর ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত তদন্ত হলে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাসপোর্ট অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ জালিয়াতিকে সবচেয়ে বড় মাপের অপরাধ হিসেবে ধরা হয়।

কারণ এক্ষেত্রে নাম-পরিচয় বদলে একজন অপরাধীর পক্ষে একাধিক মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে এ ধরনের অপরাধে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হয়।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রেকর্ডকিপার মোফাজ্জেল হোসেনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, আপনি আমার মোবাইল নম্বর কোথায় পেলেন। এরপর তিনি কোনো বক্তব্য না দিয়ে ফোন লাইন কেটে দেন।

পাসপোর্ট অধিদফতরের ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের কয়েকজন জানান, পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে চূড়ান্তভাবে পাসপোর্ট বই ছাপার আগে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

এর মধ্যে আবেদনপত্র গ্রহণ, পুলিশ ভেরিফিকেশন ও ছাপার অনুমোদন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কোনো একটি ধাপে অনিয়ম করা হলে আরেকটি ধাপে সেটি আটকে যাওয়ার কথা।

কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে এতগুলো পাসপোর্ট ইস্যু করা হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ধাপেই তা আটকানো হয়নি। ফলে এখন শুধু একজন রেকর্ডকিপারকে শাস্তি দিলেই হবে না, পুরো চক্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।